
আজ বাদে কাল নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু। কিন্তু এখনো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলে প্রায় ৩৪ কোটি বই মুদ্রণই হয়নি। অর্থ্যাৎ নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৪০ কোটি ১৬ লাখ বিতরণযোগ্য বইয়ের মধ্যে গতকাল সোমবার পর্যন্ত মাত্র ৬ কোটির কিছু বেশি বই ছাপানো সম্ভব হয়েছে। যার বেশির ভাগই উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে নতুন বছরের প্রথম দিনে সারা দেশে সব শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে পারছে না সরকার। এর ফলে সরকারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোডের্র (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা। অন্যদিকে নতুন বছরের প্রথম দিনে স্কুলে স্কুলে যে বই উৎসব করা হতো সেটি এবার থেকে হচ্ছে না। আর্থিক ক্ষতি এবং তড়িগড়িতে বইয়ের মান খারাপ হয় বলে অন্তর্বর্তী সরকার বই উৎসব না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু পাঠ্যবইয়ের অনলাইন ভার্সন উদ্বোধন করবে সরকার। আগামীকাল ১ জানুয়ারি সকাল ১০টায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিকতা না থাকায় নিজ নিজ স্কুলে প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া হবে। আলাদা করে কোনো অনুষ্ঠান করা হবে না বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।
*অর্থের অপচয় রোধে উদ্বোধন হবে অনলাইনে
*বাতিল হওয়া ২৭ লট বইয়ের কার্যাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে দেওয়ার পরিকল্পনা
*নতুন বছরের প্রথম দিনে বই পাবে যেসব ক্লাসের শিক্ষার্থীরা
*পরিমার্জিত ৪৪১টি বই আপলোড হচ্ছে অনলাইনে
এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে অন্ততপক্ষে তিনটি করে নতুন বই (বাংলা, ইংরেজি ও গণিত) দিয়ে শিক্ষাবর্ষ শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বই ছাপার যে গতি, তাতে সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা দুরূহ বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। বই ছাপানোর এই সংকটের কারণে সারা দেশে সীমিত আকারে বই বিতরণ নিয়েও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যথাসময়ে বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ না হওয়ায় বছরের প্রথম দিনে কোন কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বই পাবে, আর কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বই পাবে না; তা নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকরা উৎকণ্ঠায় রয়েছেন।
এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক শাখা সূত্রে জানা গেছে, নতুন শিক্ষাবর্ষে বছরের প্রথম দিনেই সব শিক্ষার্থী অন্তত তিনটি করে বই পাবে। এর মধ্যে প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ের কিছু বইও পাবে। ৫ জানুয়ারির মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির সব বই পৌঁছে যাবে। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য তিনটি করে বই বছরের প্রথম দিনে যাবে। এসব শ্রেণির আরও ৫টি করে বই ১০ জানুয়ারির মধ্যে যাবে। বাকি বইগুলো ২০ জানুয়ারির মধ্যে সব শিক্ষার্থীর হাতে যাবে বলে আশা করছে এনসিটিবি।
সূত্র আরও জানায়, গতকাল সোমবার পর্যন্ত প্রাথমিকের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির ৭০ লটের বই ছাপা সম্পন্ন হয়েছে। সেগুলো উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে পুনঃটেন্ডার হওয়ায় বাকি ২৭ লটের বই এখনও ছাপা শেষ হয়নি। এ তিন শ্রেণির বাকি বইগুলো ছাপা শেষ করে পৌঁছে দিতে জানুয়ারি মাসের পুরোটা সময় লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এ রিয়াজুল হাসান ভোরের ডাককে বলেন, বছরের প্রথম দিনই (১ জানুয়ারি) প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির সব বই এবং চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বই দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। আর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিরও বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বই আংশিক দেওয়া হবে। এগুলো এমনভাবে বিতরণ করা হবে, যাতে করে প্রত্যেক উপজেলায় কিছু না কিছু নতুন বই যায়। আর বাকি বইগুলো আমরা ধাপে ধাপে উপজেলা পর্যায়ে পাঠিয়ে দিব। তিনি আরও জানান, সোমবার পর্যন্ত আমাদের ৬ কোটির কিছু বই মুদ্রণ করা সম্ভব হয়েছে। যার বেশির ভাগই উপজেলায় চলে গেছে। বাকি বইগুলো মুদ্রণ শেষ হলে আমরা ধাপে ধাপে উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিব। এ ছাড়া যেসব বইয়ের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো আমরা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতাকে দেওয়ার প্রক্রিয়া করছি। এ বিষয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, প্রাথমিকের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির অল্প কিছু বই ছাপা হয়েছে। বেশিরভাগ বই ছাপার কাজই এখনো শুরু হয়নি। সেক্ষেত্রে এ দুটি শ্রেণির খুব অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী দুটি করে নতুন বই হাতে পেতে পারে। বাকি শিক্ষার্থীদের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। সব বই পৌঁছাতে এনসিটিবির পুরো জানুয়ারি মাস লেগে যেতে পারে।
এনসিটিবি জানিয়েছে, মাধ্যমিকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির দেড় কোটির কিছু বেশি বই ছাপা হয়েছে, যার মধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় এক কোটি বই ছাপানো হয়েছে। সাধারণ প্রেস মালিকদের ছাপাখানায়ও ষষ্ঠ-সপ্তমের কিছু বই ছাপার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে ষষ্ঠ-সপ্তমের দুটি থেকে তিনটি করে বই কিছু উপজেলার স্কুলে যেতে পারে। তা ছাড়া দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা দুই থেকে তিনটি করে বই কিছু উপজেলার শিক্ষার্থীরা হাতে পেতে পারে। তবে অষ্টম ও নবম শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থী বছরের শুরুতে কোনো বই নাও পেতে পারে। বই হাতে পেতে তাদের পুরো জানুয়ারি মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। অষ্টম-নবমের শিক্ষার্থীদের হাতে সব কয়টি বই পৌঁছে দিতে আরও দেড় থেকে দুইমাস সময় লাগতে পারে এনসিটিবির।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরী বলেন, ৬৫৫টি বই সংশোধন-পরিমার্জন করতে হয়েছে। সব শ্রেণির বইয়ের পান্ডুলিপি নতুন করে করা। তাছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে গল্প-গ্রাফিতি নির্বাচন করে বইয়ে যুক্ত করা হয়েছে। এসব করতে বড় একটা সময় লেগে গেছে। আবার অন্যবার ৩০-৩২ কোটির মতো বই ছাপানো হয়। এবার বইয়ের সংখ্যা অনেক বেশি; প্রায় সোয়া ৪০ কোটি।
বই উৎসবের উদ্বোধন হবে অনলাইনে
এদিকে বিনামূল্যে বছরের শুরুতে বই দেওয়া শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। বিগত ১৫ বছর বছরের প্রথম দিনে সরকার ঘটা করে বই উৎসব করত। এটিকে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অর্জনগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবেও দাবি করত। এর মধ্যে গত বছর যথাসময়ে বই ছাপাতে না পারলেও বই উৎসব হয়েছে। ১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে বই উৎসবের উদ্বোধন করতেন। এরপর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি স্কুলে বড় অনুষ্ঠান করতো। তাছাড়া বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা, পৌরসভা পর্যায়ে ঘটা করে বই বিতরণে অনুষ্ঠান করা হতো। বই উৎসব ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ বাজেট করতো সরকার। এতে যেমন সরকারের আর্থিক ক্ষতি হতো, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আর উৎসাহ কাজ করত।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, আর্থিক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ঘটা করে বই উৎসব না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতি এবং তড়িগড়িতে বইয়ের মান খারাপ হয়। তাই এবার স্বল্প পরিসরেও বই বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে না। শুধু পাঠ্যবইয়ের অনলাইন ভার্সন উদ্বোধন করবে সরকার। আগামীকাল ১ জানুয়ারি সকাল ১০টায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
পরিমার্জিত ৪৪১টি বই আপলোড হচ্ছে অনলাইনে :
এনসিটিবি সূত্র জানায়, পাঠ্যবইয়ে অতিরঞ্জিত ইতিহাস-সহ বিভিন্ন পরিমার্জন করা হচ্ছে এবারের শিক্ষাবর্ষে। কয়েকটি গল্প-কবিতা বাদ দিয়ে নতুন করে গল্প-কবিতা সংযোজন করা হচ্ছে। আর ইতিহাসনির্ভর বিষয়বস্তুতেও আনা হচ্ছে পরিবর্তন। এরইমধ্যে ৬৯১টি বইয়ের পরিমাজর্ন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪১টি বইয়ের পরিমার্জন সম্পন্ন করে পিডিএফ ভার্সনে রূপান্তর করা সম্পন্ন হয়েছে। শিগগিরই এগুলো এনসিটিবি’র ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে বলে জানান সংস্থাটি।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম রিয়াজুল হাসান জানান, সোমবারের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। এরপর এটি প্রকাশের জন্য প্রস্তুত হবে। শিগগিরই অনলাইনে এসব বই পাওয়া যাবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণি এবং মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন শুরু করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। পরে চলতি ২০২৪ সালে প্রাথমিকের দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণি, ২০২৫ সালে প্রাথমিকের চতুর্থ ও পঞ্চম এবং মাধ্যমিকের দশম শ্রেণি নতুন শিক্ষাক্রমের আওতায় আসে। এই শিক্ষাক্রমের আলোকে ২০২৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের একাদশ এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণি পাঠদানের কথা ছিল। তবে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর থেকেই এ নিয়ে নানা সমালোচনা শুরু হয়। গত ৫ আগস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর আলোচিত-সমালোচিত এই পাঠ্যক্রমই স্থগিত করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ফিরে যাওয়া হয় পুরনো কারিকুলামেই।