বাসার কাছের সড়ক। পরিচিত পথ ধরে হাঁটছিলেন এক দম্পতি। হঠাৎ অটোরিকশায় এসে তাঁদের ঘিরে ধরে চার যুবক। মুহূর্তেই চাপাতি বের করে ভয় দেখায় তারা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দম্পতির হাতে থাকা দুটি আইফোন নিয়ে পালিয়ে যায় যুবকেরা। গত ২১ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে ঘটে এ ঘটনা। সড়কের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে ছিনতাইয়ের পুরো দৃশ্য।
ঘটনার পর একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কিন্তু ছিনিয়ে নেওয়া মুঠোফোন দুটি তখনো উদ্ধার হয়নি বলে জানিয়েছিল পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই সড়কে এক সপ্তাহেই ঘটেছে পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা। এর মধ্যে ২১ অক্টোবরের ঘটনার মাত্র ১৫ ঘণ্টা না পেরোতেই পরদিন ভোরে একই এলাকায় আবার ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠে।
সলিমুল্লাহ রোড, রায়েরবাজার ও বুদ্ধিজীবী সড়কে ছিনতাইয়ের অভিযোগ; অস্ত্রের মুখে লুট, আতঙ্কে বাসিন্দারা
দিনের ব্যস্ত সময় হোক কিংবা ভোরের নির্জন গলি, ছিনতাইয়ের অভিযোগ যেন পিছু ছাড়ছে না মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাদের। সলিমুল্লাহ রোডের বাইরে রায়েরবাজার ও বুদ্ধিজীবী সড়কেও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও কয়েক হাজার টাকা ও মুঠোফোন, কোথাও চার লাখ টাকা লুটের অভিযোগ। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ; চলছে আরও অভিযানের প্রস্তুতি ও তদন্ত। তবু কাটছে না আতঙ্ক। বাসার কাছের পরিচিত সড়কেও যদি আচমকা অস্ত্রের মুখে পড়তে হয়, তাহলে নিরাপদে চলাচল করবেন কোথায়, এ প্রশ্ন এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের। একের পর এক ছিনতাইয়ের অভিযোগের মধ্যে তাই শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার নয়, আবাসিক এলাকার সড়ক ও গলিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
সলিমুল্লাহ রোডে এক সপ্তাহে পাঁচ ছিনতাইয়ের অভিযোগ : গত ২১ অক্টোবর বিকেলে সলিমুল্লাহ রোডে এক দম্পতির কাছ থেকে দুটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ফুটেজে দেখা যায়, অটোরিকশায় আসা চার যুবক দম্পতিকে ঘিরে ধরে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মুঠোফোন নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ২২ অক্টোবর মানিক মিয়া (২৩) নামের একজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে আগে ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা থাকার তথ্যও দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছিনিয়ে নেওয়া ফোন উদ্ধারে অভিযান চলছিল বলে জানানো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই সড়কে এক সপ্তাহে পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ অক্টোবরের ঘটনার ১৫ ঘণ্টা না পেরোতেই পরদিন ভোরে একই এলাকায় আরেকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর আগে ১৩ অক্টোবরও অস্ত্র দেখিয়ে এক ব্যক্তির মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
এসব ঘটনায় এলাকাবাসীর উদ্বেগের কারণ শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়। দিনের ব্যস্ত সময় কিংবা ভোরের নির্জন সড়ক, কোনো সময়ই তাঁরা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না বলে অভিযোগ। বিশেষ করে অটোরিকশায় করে এসে কয়েকজন মিলে পথচারীকে ঘিরে ধরার কৌশল তাঁদের মধ্যে ভীতি তৈরি করেছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া ঘটনার সংখ্যা ও পুলিশের নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা এক কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি অভিযোগের তথ্য যাচাই এবং ঘটনার সময়, স্থান ও ধরন বিশ্লেষণ করলেই ওই সড়কে ছিনতাইয়ের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
রায়েরবাজার ও বুদ্ধিজীবী সড়কেও একই ধরনের অভিযোগ : ছিনতাইয়ের অভিযোগ সলিমুল্লাহ রোডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার ও বুদ্ধিজীবী সড়ক এলাকাতেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ ও গণমাধ্যমের তথ্যে উঠে এসেছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা, একটি সাধারণ মুঠোফোন ও একটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় চারজন জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে। একই চক্র হোসেন সাহেবের গলিতে এক ব্যক্তির কাছ থেকে চার লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিল বলেও পুলিশের তথ্য রয়েছে।
এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯ বছর বয়সী মিঠু মিয়াকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ১৮ অক্টোবর রাত সাড়ে চারটার দিকে বুদ্ধিজীবী রোডের মিনা হাউজ গলিতে ছিনতাইয়ের একটি ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর কাছ থেকে একটি সামুরাই উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। রায়েরবাজারের আগের একটি ঘটনায়ও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই এলাকার একাধিক সড়ক ও গলিতে কাছাকাছি সময়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগ ওঠায় ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। একই ব্যক্তি বা চক্র একাধিক ঘটনায় জড়িত থাকলে তা শনাক্ত করা এবং ছিনিয়ে নেওয়া মালামাল উদ্ধার করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ১৩ : ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের তৎপরতার মধ্যে ২৪ অক্টোবর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মোহাম্মদপুরে ২৪ ঘণ্টায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে নারী, পুরুষ ও কিশোরসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র এবং ছিনিয়ে নেওয়া চারটি মুঠোফোন উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হালিম। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে তিনটি সুইচ গিয়ার, দুটি ধারালো চাকু, চারটি লোহার রড ও একটি করাত কাটার চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন কিশোর ও একজন নারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে হাসনাইন হাসানের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও শেরেবাংলা নগর থানায় ছিনতাইয়ের অন্তত ছয়টি মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর আগে ১৩ অক্টোবর রাতে মোহাম্মদপুর, আদাবর, পল্লবী ও গেন্ডারিয়া এলাকায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ ব্লক রেইডে ৪৪১ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ওই অভিযানে আটটি আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের কথাও জানানো হয়। তবে বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সবাই ছিনতাইয়ে জড়িত ছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অভিযানের সামগ্রিক ফলাফলের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা, তদন্ত, গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধারের অগ্রগতিও আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এক গলি এড়িয়ে অন্য গলিতে অপরাধ : মোহাম্মদপুরে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান এবং ব্লক রেইড জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান বলেন, অপরাধীরা পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে এক গলি এড়িয়ে অন্য গলিতে গিয়ে অপরাধ করছে। এ কারণে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের এ বক্তব্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের একটি চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়। কোনো নির্দিষ্ট সড়কে পুলিশের উপস্থিতি বাড়লে অপরাধীরা পাশের সড়ক বা গলিতে চলে গেলে শুধু একটি জায়গায় অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সুফল পাওয়া কঠিন। এ ক্ষেত্রে আশপাশের সড়কগুলোকে সমন্বিত নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, সন্দেহভাজনদের চলাচলের পথ শনাক্ত এবং ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া জরুরি। একাধিক ঘটনায় একই কৌশল, যানবাহন বা সন্দেহভাজনের মিল পাওয়া গেলে তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কীভাবে : আবাসিক এলাকার সড়কে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে। কর্মস্থলে যাওয়া, বাজার করা কিংবা ভোরে বের হওয়া, স্বাভাবিক কাজেও তৈরি হয় নিরাপত্তাহীনতা। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে মুঠোফোন বা টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে শারীরিকভাবে আহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক (অপরাধ বিশেষজ্ঞ) ড. তৌহিদুল হক ভোরের ডাক’কে বলেন, অপরাধের পর কাউকে গ্রেপ্তার করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘটনার আগেই অপরাধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। কোন সড়কে এবং দিনের কোন সময়ে বেশি ছিনতাইয়ের অভিযোগ আসছে, তা বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা যেতে পারে। এরপর সেই স্থানগুলোতে নিয়মিত টহল, কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি এবং দ্রুত পুলিশি সাড়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গ্রহণ ও মামলা নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। কোনো ঘটনা ছোট বলে অবহেলা করা হলে বা অভিযোগ নথিভুক্ত না হলে অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যেতে পারে। নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে কোন এলাকায় ছিনতাই বাড়ছে, একই চক্র বারবার সক্রিয় হচ্ছে কি না এবং পুলিশের পদক্ষেপে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা সম্ভব বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক।
মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোড, রায়েরবাজার ও বুদ্ধিজীবী সড়কের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকলেও বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, তাঁদের প্রতিদিনের চলাচলের পথগুলো নিরাপদ হবে। সেই প্রত্যাশা পূরণে শুধু অপরাধের পর গ্রেপ্তার নয়, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে ধারাবাহিক নজরদারি, দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং ছিনতাই প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।