
সর্বশেষ সোমবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকসেবীদের একটি আড্ডাস্থলে পিস্তল উঁচিয়ে তেড়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিএনপির ভেতরেও এ নিয়ে সরব হন একাধিক মন্ত্রী ও নেতা। এর পরই তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
এর আগে গত মাসে পদত্যাগ করেন বিএনপির মনোনীত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় অনৈতিকভাবে ক্ষমতা প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছিল। গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তি হামলা চালান। হামলাকারীরা কেন্দ্রটি ভাঙচুর করেন, মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করেন এবং প্রাঙ্গণ দখল করে সেখানে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। এতে প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয় বলে জানা যায়। ওই ঘটনায় বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থাকা প্রবীণ নেত্রী মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। দলীয় ও পুলিশি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগ করতে বলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে—কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের অবস্থানের সঙ্গে তাঁর বাবা, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির মিল। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, নেতৃত্বের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের যে কঠোর ভাবমূর্তি ছিল, তারই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার উপপ্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টারকানেক্টর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু বাবা জিয়াউর রহমান নন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মা খালেদা জিয়াও দলের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও বিশৃঙ্খলা রোধে তিনি প্রবীণ নেতাদের নিয়ে বিভিন্ন শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করেন। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কাজ করা কিংবা কোন্দলে জড়ানোর অভিযোগে সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া এবং সাময়িক বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়।
“মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনিয়ম কিংবা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পেলেই প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখি। এতে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ মানুষের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যায়। তবে আমি এটাও মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ামাত্র ইশরাক পদত্যাগ করে দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। ইশরাকও দলের জন্য নিবেদিত। আমি বিশ্বাস করি, দলের প্রতি তাঁর এই আনুগত্য তাঁকে ভবিষ্যতে আরও বড় জায়গায় নিয়ে যাবে।
সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দার
বিএনপির জোটসঙ্গী ও ১২-দলীয় জোটের প্রধান, সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জামাল হায়দার ভোরের ডাককে বলেন, ‘মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনিয়ম কিংবা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পেলেই প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখি। এতে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ মানুষের কাছেও ইতিবাচক বার্তা যায়। তবে আমি এটাও মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ামাত্র ইশরাক পদত্যাগ করে দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। ইশরাকও দলের জন্য নিবেদিত। আমি বিশ্বাস করি, দলের প্রতি তাঁর এই আনুগত্য তাঁকে ভবিষ্যতে আরও বড় জায়গায় নিয়ে যাবে।’
“প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শরীরে তাঁর বাবা জিয়াউর রহমানের রক্ত প্রবাহিত। আমিও বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলাম। ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার উপপ্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেশ কিছু পদক্ষেপে জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন
জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ভোরের ডাককে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শরীরে তাঁর বাবা জিয়াউর রহমানের রক্ত প্রবাহিত। আমিও বিএনপির সংসদ সদস্য ছিলাম। ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর মন্ত্রিসভার উপপ্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেশ কিছু পদক্ষেপে জিয়াউর রহমানের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি।’
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ইশরাক হোসেনকে অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেন, শুধু ইশরাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে—এমন কোনো উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে না।
আখতার হোসেন বলেন, ‘ইশরাকের পদত্যাগ কি শুধু অস্ত্র সামনে নিয়ে আসার বিষয়, নাকি এর সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরও কোনো সম্পর্ক রয়েছে—সে প্রশ্নও সামনে আসছে। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এসব পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের কেউ কেউ।
ইন্ডিয়ান মিডিয়া করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশের সভাপতি ও সাংবাদিক শাহীন চৌধুরী ভোরের ডাককে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সেই সরকারের প্রধান হিসেবে তারেক রহমান জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন—এটাই প্রত্যাশিত। মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দেশি-বিদেশি মহলে এই বার্তা দিতে পারেন যে সরকার দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দিতে চায় না। দলের কোনো নেতা যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।’
“দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগকে প্রশ্রয় না দেওয়ার বার্তা বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের নেতাদের দুর্নীতি ও দাদাগিরির কারণে ২০২৪ সালের আন্দোলনে দলটির পতন হয়েছিল।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালের নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকার
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালের নির্বাহী সম্পাদক অমল সরকারও তারেক রহমানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে ২০২৪ সালের আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
ভোরের ডাককে অমল সরকার বলেন, ‘দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগকে প্রশ্রয় না দেওয়ার বার্তা বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের নেতাদের দুর্নীতি ও দাদাগিরির কারণে ২০২৪ সালের আন্দোলনে দলটির পতন হয়েছিল। বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কয়েকটি পদক্ষেপ দেখে দূর থেকে উপলব্ধি করতে পারছি, তিনি দুর্নীতি ও দাদাগিরিকে প্রশ্রয় দিতে চান না। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও এর আগে সংসদ সদস্য মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনা সেটিই প্রমাণ করে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই।’