জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও তার ওপরের পদমর্যাদার ১৪৭ কর্মকর্তাকে ‘জনস্বার্থে’ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩১ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, বাকি ৩১ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদসহ কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৩ আগস্ট কমিটির প্রথম বৈঠকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী এবং শাস্তিপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার বিবরণ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকেন্দ্রিক ঘটনায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত বা পলাতক থাকার অভিযোগে এএসপি ও তার ওপরের পদমর্যাদার ৫৭ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও করা হয়। এর মধ্যে ২৮ জনকে বিভাগীয় মামলার ভিত্তিতে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা, আদালতে দায়ের করা অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডিআইজি পদমর্যাদার দুজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর ২০২৫ সালের চারটি মামলার রায়ের ভিত্তিতে এএসপি ও তার ওপরের পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দণ্ডিত পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি আটজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার কারণে পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার পাঁচ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে। একই ঘটনায় আরও ৩০ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসরে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গত ১৩ আগস্ট সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠকে গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের আবারও গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন সংসদ সদস্য।
কমিটির সদস্য শিরীন সুলতানা প্রশ্ন তোলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত বা নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী এবং শাস্তিপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তা কীভাবে নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশের থানায় আবার পদায়ন পাচ্ছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আরেক সদস্য মনোয়ার হোসেন বলেন, গুম কমিশনের প্রতিবেদনে নাম থাকা এবং বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া কিছু কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন পদে বহাল রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বৈঠকে পুলিশের মনোবল পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। সংসদ সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের অবকাঠামো ও যানবাহনের ক্ষতির পাশাপাশি সদস্যদের মনোবল ও মানসিক অবস্থার ওপরও বড় প্রভাব পড়েছে। পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রয়েছে কি না, তা জানতে চান তিনি।
জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, পুলিশের মনোবল বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মবের কারণে পুলিশকে দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন বাধা ও বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে বলেও জানান তিনি। থানায় পুলিশ কর্মকর্তা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সচিব।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, পঞ্চম বৈঠকে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ সময় ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান এবং দুই বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপরাধের হিসাব উপস্থাপন করা হয়।
ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র আইন এবং বিস্ফোরক দ্রব্যসংক্রান্ত মামলার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিসংখ্যানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতির চিত্র উঠে এসেছে। এতে সন্তোষ প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা।
বৈঠকে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করে কমিটি। পাশাপাশি পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়।
রাজধানীর সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম ও অগ্রগতি তুলে ধরেন।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু এবং সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন, শিরীন সুলতানা, নূরুল ইসলাম ও আব্দুল বাতেন।