দেশে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাবে বাড়ছে উদ্বেগ। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, আর হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ। অন্যদিকে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭০ জনে। দুই রোগের সংক্রমণ ও প্রাণহানির এই চিত্র দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিন অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে। এর মধ্যে অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনে মারা গেছেন ৭১ জন। চলতি বছরের মাসভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আগস্টে ৪৩, জুলাইয়ে ৩৬, জুনে ১৩, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে মারা গেছেন।
সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৫৪ জন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৯৬ জনে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ হাজার ৯৬৫ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন মোট ৯৭ হাজার ২৯৬ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে—৮৪৫ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৩১৮, খুলনায় ২৩০, বরিশালে ১৯৬, রাজশাহীতে ১৮৪, ময়মনসিংহে ৯৭ এবং রংপুরে ৭১ জন ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৬ জনে। আর নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০৪ জন। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৭০।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারও মৃত্যু হয়নি। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে তিনজন ঢাকা বিভাগের, একজন সিলেটের এবং দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৭৪ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৭১ জনে।
একই সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরও ১৩৯ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে মোট ২২ হাজার ৭১২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৯ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন।
একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা হাম আবার বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রায় আট বছর ধরে দেশে হামে সংক্রমণের সংখ্যা ৪০০ ছাড়ায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল এবং ২০২৬ সালে নির্মূলের সনদ পাওয়ার আশা করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশার বিপরীত।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালে হামের টিকাদান কার্যক্রমে অবহেলা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। চলতি বছরের শুরুতে সংক্রমণ দেখা দিলেও শুরু থেকেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে তাঁরা মনে করেন। মার্চ থেকে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল ও মে মাসে গণটিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও সে সময় প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হামের উপসর্গে ব্যাপক প্রাণহানি—দুই পরিস্থিতিই দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।