কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাকে ঘিরে চীনের কথিত গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চীনা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা এবং গবেষণার অর্থায়ন এখন নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫ প্রকাশ্যে এ বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের ওই সতর্কতায় চায়না জেনারেল টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিজিটিআরআই)-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষণা প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়। এমআই৫-এর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের (এমএসএস) ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং এর অর্থায়নে পরিচালিত কিছু গবেষণা চীনের গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগতে পারে।
এমআই৫ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০০-এর বেশি শিক্ষাবিদ সিজিটিআরআইয়ের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। এসব গবেষণার মধ্যে এআই ও সাইবার নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল প্রযুক্তিও রয়েছে। সংস্থাটি বলছে, সংশ্লিষ্ট অনেক গবেষক হয়তো প্রকল্পটির অর্থায়নের চূড়ান্ত উৎস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে অর্থায়নের প্রকৃত উৎস যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর আওতায় ভবিষ্যতে আইনি জটিলতার ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
চীনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যুক্তরাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছরের মে মাসে জার্মানির মিউনিখে এক দম্পতিকে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়।
জার্মানির ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ওই দম্পতি চীনা গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন এবং সামরিকভাবে ব্যবহারযোগ্য উচ্চপ্রযুক্তি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা এআই, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং মহাকাশ প্রকৌশলের সঙ্গে যুক্ত জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জার্মান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজনরা কখনো দোভাষী আবার কখনো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয়ে গবেষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কয়েকজন গবেষককে বেসামরিক বক্তৃতার কথা বলে চীনে নেওয়া হলেও পরে তাঁদের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সামনে বক্তব্য দিতে হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগের বড় একটি জায়গা হলো—বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ ব্যবহার করে সংবেদনশীল প্রযুক্তির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে কি না।
বিশেষ করে এআই, সাইবার নিরাপত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি ও অন্যান্য দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাকে ঘিরে নিরাপত্তা যাচাই জোরদারের দাবি উঠছে। কারণ এসব প্রযুক্তির বেসামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি সামরিক ও গোয়েন্দা ক্ষেত্রেও প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে এমআই৫-এর সতর্কতার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চলমান সহযোগিতা ও অর্থায়নের উৎস খতিয়ে দেখছে। ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও সংবেদনশীল গবেষণার ক্ষেত্রে অংশীদার নির্বাচন ও অর্থায়নের উৎস যাচাই আরও কঠোর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে চীনা পক্ষ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাজ্যে এমআই৫-এর সাম্প্রতিক সতর্কতার পর চীনা দূতাবাস অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছে। ফলে একদিকে গবেষণা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্ন—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য এখন পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।