বাবা নেই, সংসারের হাল ধরেছেন মা। অন্যের বাসায় কাজ করে ছেলেকে পড়িয়েছেন। ভাড়া বাসায় বেড়ে ওঠা সেই ছেলে মিশন আচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নও পূরণের পথে ছিল। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের নামে স্থায়ী বসতভিটা না থাকার কারণে নিয়োগ থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ করেছেন মিশন।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মিশন আচার্য। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কলাবাগান এলাকায় মায়ের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থেকেই বড় হয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, বহু বছর আগে বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মা বাসাবাড়িতে কাজ করে তাকে বড় করেছেন।
মিশন জানান, কলাবাগান এলাকাতেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। নিজেদের কোনো বাড়ি না থাকায় ছোটবেলা থেকেই ভাড়া বাসাই ছিল তাদের ঠিকানা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ১৭তম স্থান অর্জন করে সুপারিশপ্রাপ্ত হন মিশন। তার দাবি, ১৮২ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হলেও ১৮০ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি দুজনের একজনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং অপরজন তিনি।
মিশনের ভাষ্য, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে জমিজমা-সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে—এমন ধারণা থেকে তার খালু গ্রামের বাড়ির এলাকায় তার নামে দুই শতক জমি লিখে দেন। পুলিশ তদন্তের সময় তিনি সেই জমির দলিলও জমা দেন। তবে ওই জমিতে কোনো বসতবাড়ি নেই এবং তিনি কখনো সেখানে বসবাসও করেননি।
তার অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে স্থায়ী ঠিকানায় নিজের নামে বসতভিটা না থাকার বিষয়টি দেখিয়ে তাকে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন যখন পূরণের দ্বারপ্রান্তে, তখন এমন পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েছেন মিশন। তার প্রশ্ন—নিজের বাড়ি না থাকাটা কি তার অপরাধ?
মিশন বলেন, আমার মা বাসাবাড়িতে কাজ করে আমাকে বড় করেছেন। আমাদের আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি, পরীক্ষায় ভালো করেছি, চাকরির জন্য সুপারিশও পেয়েছি। এখন শুধু নিজের বাড়ি নেই বলে যদি চাকরিটা না পাই, তাহলে আমার কী দোষ?
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ভাড়া বাসায় জন্মেছি, এটাই কি আমার দোষ? রাষ্ট্র আমার ভোট নিচ্ছে, আমাকে খাওয়াচ্ছে, পড়াচ্ছে, কিন্তু চাকরি দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রের কাছে আমার মেধা ও পরিশ্রমের চেয়ে জমিজমার মূল্য বেশি।
মিশন নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলেও দাবি করেছেন। তার আকুতি, বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে যেন তার নিয়োগের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, মিশন আচার্যের নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে একটি জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে বিষয়টি লিখিতভাবে শিক্ষা অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিষয়টি সমাধান হবে।
একজন তরুণের দীর্ঘ সংগ্রাম, মায়ের ত্যাগ এবং নিজের মেধা দিয়ে সরকারি চাকরির দোরগোড়ায় পৌঁছেও নিয়োগ না পাওয়ার অভিযোগ—ঘটনাটি এখন মানবিক ও প্রশাসনিক দুই দিক থেকেই আলোচনায় এসেছে।