রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি ভাঙচুর ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক দিন পরই সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে শুরু হয়েছে শিশুদের হাম টিকাদান কর্মসূচি। ভবন না থাকায় খোলা জায়গায় অস্থায়ী ব্যবস্থায় টিকা নিতে এসে দুর্ভোগে পড়ছেন শিশু ও তাদের মায়েরা। ব্যাহত হচ্ছে কেন্দ্রটির অন্যান্য চিকিৎসাসেবাও।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে কেন্দ্রটির মূল ফটকের বাইরে টেবিল-চেয়ার বসিয়ে টিকাদান শুরু হয়। মাথার ওপর ত্রিপল টানিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী টিকাদানকেন্দ্র। কেউ চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছেন, কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। গরমে ছোট শিশুদের অস্বস্তি ও কান্না করতে দেখা গেছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ায় ফাঁকা জায়গায় ত্রিপল টানিয়ে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে আপাতত টিকাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশপাশের মানুষও সহযোগিতা করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে অনেক শিশু আসবে। সে জন্য ফাঁকা জায়গাতেই আমরা অস্থায়ীভাবে ব্যবস্থা করেছি। টিকাদান কার্যক্রম চলছে। তবে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা আপাতত আগের মতো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
কেন্দ্রটিতে চারজন চিকিৎসক এবং নার্স, প্যারামেডিকসহ প্রায় ১৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। তাঁরা টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও অন্যান্য চিকিৎসাসেবা সীমিত হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানায়, কিছু রোগীকে শুধু প্রেসক্রিপশন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ নেই। আলট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য সেবা নিতে আসা রোগীদের আশপাশের অন্য কেন্দ্রে যেতে বলা হচ্ছে।
নাসরিন আখতার বলেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে না জেনে অনেকে আগের মতো সেবা নিতে এসে কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা দেখে অবাক হচ্ছেন। কেউ টিকা দিতে, কেউ আলট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসছেন। কিন্তু সবকিছু ভেঙে ফেলা ও লুট করে নেওয়ায় এখন স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘মানুষ এলাকার মধ্যেই সেবা পেতে চায়। কিন্তু এখানে আমরা এখন আমাদের সাধ্যমতো শুধু টিকার কাজটা চালিয়ে যাচ্ছি।’
শনিবার সকাল থেকে ১০টির বেশি শিশু সেখানে টিকা নিতে এসেছে। দিনভর প্রায় ১০০ শিশুকে টিকা দেওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে টেবিল-চেয়ার পেতে শুরু হয় হামসহ শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি।
মিরপুরের বাসিন্দা আফসানা আক্তার তাঁর ১৫ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে টিকা দিতে এসেছেন। তিনি বলেন, এটি তাঁর সন্তানের ১৫ মাস বয়সের শেষ টিকা। আগে কেন্দ্রের ভেতরে বসেই টিকা দিতে পারতেন। এবার বাইরে এসে টিকা দিতে হচ্ছে।
আফসানা বলেন, ‘একটু অবাক হয়ে গেছি। ভাবছিলাম হয়তো ফিরে চলে যেতে হবে। কারণ, আমি রাতে ময়মনসিংহ থেকে এসেছি। আমার স্বামী সেখানে চাকরি করেন, আমরা সেখানেই থাকি। কাল রাতে ঢাকায় বাবার বাসায় এসেছি, আজ ছেলেকে এখানে টিকা দিতে নিয়ে এসেছি।’
তিন মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে টিকা দিতে আসা আয়েশা বেগম বলেন, আগেরবার ঘরের ভেতরেই টিকা দিতে পেরেছিলেন। এবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ভালো লাগছে না। বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। বাচ্চার কষ্ট হচ্ছে। গরম লাগছে, কান্নাকাটি করছে।’
কী হয়েছিল রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে: গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করেন। পরে মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নেওয়া হয়। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে মামলার এজাহারের কপি এখনো তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম শুরু করে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল। হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর এখন কেন্দ্রটির স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আপাতত খোলা জায়গায় অস্থায়ী ব্যবস্থা করে টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।