ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র এতদিন আড়ালে ছিল, এবার তা প্রকাশ্যে এসেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর জেনারেল) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলায় অন্তত ৪১৭ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সামরিক বিমান, যার মধ্যে রয়েছে অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি হিসাব তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, ১১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য যুদ্ধে এবং আরও সাতজন অযুদ্ধজনিত ঘটনায় নিহত হয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হামলা এবং যুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান, ট্যাংকার, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
এর মধ্যে অন্তত চারটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া ইরানের হামলায় অন্তত একটি এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত এবং একটি এ-১০ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে।
আকাশে যুদ্ধবিমানকে দীর্ঘ সময় সচল রাখতে ব্যবহৃত কেসি-১৩৫ ট্যাংকারের অন্তত সাতটি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে একটি ইরাকে বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু সদস্যের প্রাণহানি ঘটে। সৌদি আরবের মাটিতে থাকা আরও কয়েকটি ট্যাংকার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে একটি ই-৩ সেন্ট্রি বিমান এবং একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতির তালিকায় রয়েছে এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত এই সশস্ত্র ড্রোনের প্রায় ৩০টি ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন নজরদারি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালির কাছে একটি এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি হেলিকপ্টারও ভূপাতিত হওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিবেদনে।
শত শত মার্কিন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি
শুধু আকাশযান নয়, ইরানের হামলার প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনার শত শত ভবন ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
তবে প্রতিটি স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির পৃথক হিসাব প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি। হামলার কারণে কয়েকটি মার্কিন সামরিক স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল বলেও জানানো হয়েছে।
কূটনৈতিক স্থাপনাতেও বড় ক্ষতি
ইরানের হামলা থেকে রেহাই পায়নি মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোও। ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক মূল্য ১৮ কোটি ৪ লাখ ডলার।
ইরাকে মার্কিন কূটনৈতিক মিশন ৩০ জুন পর্যন্ত ৬০০টির বেশি হামলার মুখে পড়ে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরবিলের নতুন মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস ও বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বাগদাদ ডিপ্লোম্যাটিক সাপোর্ট সেন্টারেও।
কুয়েত সিটিতে হামলা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে মার্কিন দূতাবাসের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। এতে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে দুটি ইরানি ড্রোন আঘাত হানলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার। দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেটের একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
অস্ত্রের মজুতেও চাপ
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাত চলাকালে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি তৈরি হয় এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের জট দেখা দেয়। ফলে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়।
এই তথ্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত থাকার দাবি করেছিলেন।
এদিকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বাগদাদ, জেরুজালেম, তেল আবিব, কায়রো, আম্মান, কুয়েত সিটি ও মাসকাটে বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প বিলম্বিত হচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মাসে আনুমানিক ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের ফলে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির আরও বিস্তৃত চিত্র সামনে এসেছে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও সামরিক বিমান হারানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় ও মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা