রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আবারও তৎপরতা বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যে এবার যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধের পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো, কৃষ্ণসাগরের বন্দর ও বাণিজ্যিক নৌপথকে নিরাপদ রাখার মতো সীমিত যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ সামনে এসেছে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত, তুরস্ক, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র পৃথকভাবে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ভারতের উদ্যোগকে কিয়েভ তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত বলে বর্ণনা করেছে।
তবে এসব উদ্যোগকে এখনই পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির রূপরেখা বলা যাচ্ছে না। বরং যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাবগুলো কমিয়ে আনার মাধ্যমে বড় আলোচনার জন্য পরিবেশ তৈরিই আপাতত লক্ষ্য।
ভারতের প্রস্তাবে গুরুত্ব পাচ্ছে তিন বিষয়
ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পুরো প্রস্তাব প্রকাশ না করলেও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি বিষয়।
প্রথমত, রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা কমানো বা বন্ধ করা।
দ্বিতীয়ত, কৃষ্ণসাগরের বন্দর ব্যবহার করে খাদ্যশস্য ও জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক রাখা।
তৃতীয়ত, কৃষ্ণসাগর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ভারতের জন্য বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক নয়, বাণিজ্যিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। কৃষ্ণসাগরীয় নৌপথে ভারতীয় নাবিক ও জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়ার ঘটনাগুলো নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
জ্বালানি ও বন্দর—একসঙ্গে যুদ্ধবিরতির বার্তা কিয়েভের
ইউক্রেনের বক্তব্য, শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র বা তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলা বন্ধ করলেই জ্বালানি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে না। বন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকেও এর আওতায় আনতে হবে।
কিয়েভ একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্য এবং জ্বালানি অবকাঠামো—দুই ক্ষেত্রেই যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
ভারতের এই উদ্যোগের পেছনে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগের ভূমিকা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ইউক্রেন সফর এবং পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে ইউক্রেনীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনাতেও সংঘাত নিরসনে সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছিল।
কৃষ্ণসাগর ঘিরে তুরস্কের পুরোনো অভিজ্ঞতা
কৃষ্ণসাগর নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগে তুরস্কের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।
২০২২ সালে জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় করে তুরস্ক রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ’ বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছিল। ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনীয় খাদ্যশস্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ২০২৩ সালে রাশিয়া চুক্তিটি থেকে সরে গেলে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
এখন আবার কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল এবং শস্য রপ্তানির পথ নিরাপদ করার বিষয়ে তুরস্ক ও জাতিসংঘ নতুন আলোচনার উদ্যোগ নিচ্ছে।
মিসরের আগ্রহের কেন্দ্রে খাদ্যনিরাপত্তা
মিসরের জন্য কৃষ্ণসাগরের পরিস্থিতি সরাসরি খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে শস্য আমদানির ক্ষেত্রে ইউক্রেনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল।
ফলে কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যপথ দীর্ঘ সময় অচল থাকলে খাদ্যের দাম ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে।
এই বাস্তবতায় মিসরের উদ্যোগকে শুধু যুদ্ধবিরতির কূটনীতি হিসেবে নয়, বরং নিজেদের খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে তিন ধাপ
যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে একটি ধাপে ধাপে উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় রয়েছে—
রাশিয়া ও ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করা;
কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনের নিরাপদ করিডর পুনরায় চালু করা;
দুই দেশের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন।
সম্ভাব্য বৈঠকের স্থান হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির নামও আলোচনায় এসেছে।
মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মস্কো ও কিয়েভ সফরের পর কূটনৈতিক তৎপরতা আরও দৃশ্যমান হয়। তবে প্রস্তাবিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সময়সূচি নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মস্কোর অবস্থান: প্রকাশ্যে ইতিবাচক, বাস্তবে অনিশ্চিত
ভারতের উদ্যোগ সম্পর্কে রাশিয়ার প্রকাশ্য বক্তব্যে আপত্তির বদলে ইতিবাচক সুর দেখা গেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ভারতের শান্তি প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানানোর কথা বলেছেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনায় পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়ে তার কিছু ধারণা থাকার কথা বলেছেন।
তবে এসব বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে মস্কো ইতিমধ্যে কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে।
ইউক্রেনের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাশিয়া কিছু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে এমন প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
কিয়েভ কী চায়?
ইউক্রেন বলছে, সীমিত যুদ্ধবিরতির বিভিন্ন উদ্যোগ তারা বিবেচনা করতে প্রস্তুত। তবে জ্বালানি অবকাঠামো এবং কৃষ্ণসাগর—দুই ক্ষেত্রেই একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া উচিত বলে কিয়েভের অবস্থান।
এর পাশাপাশি সম্মুখসারিতে কোনো শর্ত ছাড়াই যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও ইউক্রেন বিবেচনা করতে প্রস্তুত বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে যেকোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সফল করতে রাশিয়ার সম্মতিও প্রয়োজন—এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছে কিয়েভ।
কেন গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন বেশি সক্রিয়?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক আগেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পৌঁছেছে।
খাদ্যশস্য, জ্বালানি, সার ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপর যুদ্ধের প্রভাবের কারণে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্বার্থও এতে জড়িয়ে গেছে।
বিশেষ করে কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোতে হামলা ও নৌযান চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় খাদ্য সরবরাহ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভারতীয় ও অন্যান্য দেশের নাবিকদের হতাহতের ঘটনাও পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক মাত্রা আরও স্পষ্ট করেছে।
জ্বালানি বাজারেও বাড়ছে চাপ
যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে।
ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ধারাবাহিক ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করছে। একই সময়ে রাশিয়াও ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম এবং সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
অতীতের উদ্যোগ কেন টেকেনি?
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একাধিকবার যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এর অন্যতম কারণ হিসেবে দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাসকে সামনে আনা হচ্ছে। অতীতে সীমিত যুদ্ধবিরতি নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগও উঠেছে।
ইস্তাম্বুলে আলোচনা এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোও শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে রূপ নেয়নি।
এ কারণে নতুন কোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে শুধু প্রস্তাব তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেটি কীভাবে বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: রাশিয়ার যুদ্ধসংক্রান্ত অবস্থান বদলাবে কি?
সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূখণ্ডসংক্রান্ত দাবি, ইউক্রেনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয়গুলো বড় বাধা হিসেবে রয়েছে।
মস্কো ইউক্রেনের কয়েকটি অঞ্চলের ওপর দাবি বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ে বিভিন্ন শর্তও সামনে রেখেছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন নিজের ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিয়ে ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক।
ফলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভারত, তুরস্ক, মিসর কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কতটা সক্রিয়—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে দুই যুদ্ধরত পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রশ্ন।
সামনে কী সম্ভাবনা?
বর্তমান উদ্যোগগুলোকে যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এগুলোকে একটি সীমিত ও বাস্তবভিত্তিক যুদ্ধবিরতির দিকে যাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ, কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করা এবং খাদ্যশস্য রপ্তানির পথ সচল রাখা—এই বিষয়গুলোতে সমঝোতা হলে যুদ্ধের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রভাব কিছুটা কমতে পারে।
ভারত এখানে কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তুরস্কের রয়েছে কৃষ্ণসাগর নিয়ে আগের মধ্যস্থতার অভিজ্ঞতা। মিসরের রয়েছে খাদ্যনিরাপত্তার সরাসরি স্বার্থ। আর যুক্তরাষ্ট্র উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা করছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মস্কো ও কিয়েভের সম্মতি, বাস্তবায়নের механизм এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির ওপর।
অর্থাৎ, নতুন উদ্যোগগুলো যুদ্ধের অবসানের নিশ্চয়তা না দিলেও যুদ্ধের ক্ষতি কমানো এবং বড় ধরনের শান্তি আলোচনার জন্য একটি নতুন কূটনৈতিক পথ তৈরি করতে পারে। সেই পথ স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: আল-জাজিরা