নব্বইয়ের প্রজন্মের হৃদয়ে আজও জীবন্ত বিটিভির সেই চার সিরিয়াল

বিনোদন ডেস্ক

বিনোদন

আপনার কি মনে আছে সেই সময়ের কথা? ঘরে তখন একটা টেলিভিশনই ছিল। রিমোট নিয়ে চ্যানেল বদলানোর সুযোগ নেই, ইউটিউবে সার্চ

2026-09-03T18:22:06+00:00
2026-09-03T18:22:06+00:00
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিনোদন
নব্বইয়ের প্রজন্মের হৃদয়ে আজও জীবন্ত বিটিভির সেই চার সিরিয়াল
বিনোদন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২২ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
আপনার কি মনে আছে সেই সময়ের কথা? ঘরে তখন একটা টেলিভিশনই ছিল। রিমোট নিয়ে চ্যানেল বদলানোর সুযোগ নেই, ইউটিউবে সার্চ করে পছন্দের অনুষ্ঠান দেখারও উপায় নেই। তাই নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে প্রিয় অনুষ্ঠান দেখার জন্য টিভির সামনে জায়গা দখল করাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি!

আর শুক্রবার রাত মানেই যেন ছিল অন্যরকম উত্তেজনা। রাত ৮টার বাংলা সংবাদ শেষ হলেই অনেকের চোখ আটকে থাকত টেলিভিশনের পর্দায়। কারণ এরপরই আসতে পারে সেই বহু প্রতীক্ষিত ‘আলিফ লায়লা’। নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে বাংলা ডাবিংয়ে প্রচারিত বিদেশি সিরিয়ালগুলো এক প্রজন্মের দর্শকের কল্পনার জগৎটাই বদলে দিয়েছিল।

কোনো কোনো এলাকায় তো কারও বাড়িতে টিভি থাকলেই শুক্রবার রাতে সেখানে মানুষের ভিড় জমে যেত। বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যাটারিতে টিভি চালানোর ব্যবস্থাও হতো। সিরিয়াল শুরুর আগেই সবাই জায়গা নিয়ে বসে যেত—কারণ পর্ব শুরু হয়ে গেলে মাঝখান থেকে ঢুকে জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব!

‘আলিফ লায়লা’ মানেই রহস্য আর ভয়

আরব্য রজনীর গল্প অবলম্বনে তৈরি ভারতীয় সিরিয়াল ‘আলিফ লায়লা’ বাংলা ভাষায় বিটিভিতে প্রচারের পর রীতিমতো ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে যায়। সিন্দাবাদ, কেহেরমান, মালিকা হামিরা, তায়েব—চরিত্রগুলো তখন শুধু টিভির চরিত্র ছিল না, শিশু-কিশোরদের আড্ডারও অংশ হয়ে উঠেছিল।

কেহেরমান পর্দায় এলেই অনেক শিশুর বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যেত। আবার ভয়ংকর কোনো দৃশ্য এলে কেউ চোখ বন্ধ করত, কেউ কম্বলের নিচে মুখ লুকাত!

আর সিরিয়াল শেষ হওয়ার পরদিন স্কুলে আলোচনা তো থাকতই—‘কালকের পর্ব দেখছিস?’

সিন্দাবাদের ‘সোলেমানি তরবারি’ কিংবা কোনো জাদুকরের কাণ্ড নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে এমন সব আলোচনা হতো, মনে হতো সবাই যেন সেই জাদুর রাজ্যের বাসিন্দা।

সিন্দাবাদ এলেই সমুদ্রযাত্রা!

‘আলিফ লায়লা’র পর ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অব সিন্দবাদ’ ছিল আরেক বিস্ময়। সমুদ্রযাত্রা, অচেনা দ্বীপ, জাদুকর, ডাইনি আর অদ্ভুত সব প্রাণী—সব মিলিয়ে কিশোরদের জন্য ছিল একেবারে জমজমাট প্যাকেজ।

সিন্দাবাদ, মেভ, লঙ্গার, ডোবার—চরিত্রগুলোর নাম তখন অনেকের মুখস্থ।

এমনকি স্কুলে কারও শরীর একটু ভারী হলেই বন্ধুরা মজা করে তাকে ‘ডোবার’ বলে ডাকত—এমন স্মৃতিও অনেকের আছে। অর্থাৎ সিরিয়াল শুধু দেখা হতো না, সেটি ঢুকে পড়েছিল দৈনন্দিন জীবনেও!

রবিনহুড দেখেই হাতে বাঁশের ধনুক!

তারপর এলো ‘দ্য নিউ অ্যাডভেঞ্চার্স অব রবিনহুড’। গরিবের বন্ধু রবিনহুড তখন শিশু-কিশোরদের কাছে রীতিমতো নায়ক।

রবিনহুডের তীর-ধনুক দেখে অনেকেরই ইচ্ছা হতো নিজের একটা ধনুক বানানোর। ফলে বাঁশের কঞ্চি, সুতা আর কল্পনাশক্তি দিয়েই শুরু হয়ে যেত ‘রবিনহুড খেলা’! সিরিজটি ১৯৯৭ সালে বিটিভিতে বাংলা ডাবিংয়ে প্রচার শুরু করে এবং তরুণ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

তখন কারও হাতে মোবাইল ছিল না, কিন্তু বিনোদনের অভাবও ছিল না। একটা বাঁশের কঞ্চিই যথেষ্ট ছিল নিজেকে রবিনহুড ভাবার জন্য!

টিপু সুলতান মানেই ইতিহাসের রোমাঞ্চ

ইতিহাসের সঙ্গে অ্যাকশন আর বীরত্বের স্বাদ এনে দিয়েছিল ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’। মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত এই সিরিজও বিটিভির দর্শকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

সিরিজটির নির্মাণের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শুটিং সেটে আগুন লেগে বহু মানুষ হতাহত হন। পরিচালক ও নাম-ভূমিকায় থাকা সঞ্জয় খানও গুরুতর আহত হন।

বাংলাদেশে সিরিজটির বাংলা ডাবিং প্রচারের পর টিপু সুলতানের বীরত্বের গল্পও দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে।

শুধু এই চারটি নয়, তালিকাটা ছিল আরও লম্বা

বিটিভির সেই সময়ের বিদেশি সিরিয়ালের তালিকা করলে ‘ম্যাকগাইভার’, ‘এক্স-ফাইলস’, ‘নাইট রাইডার’, ‘হারকিউলিস’, ‘এ-টিম’, ‘এয়ারউলফ’, ‘মিস্টার বিন’, ‘স্পেলবাইন্ডার’, ‘ওশিন’—এমন অনেক নামই সামনে আসে।

‘ম্যাকগাইভার’ দেখলে মনে হতো, মাথা থাকলে পৃথিবীর যেকোনো বিপদ থেকে বের হওয়া সম্ভব! ‘নাইট রাইডার’-এর কিট নামের বুদ্ধিমান গাড়ি দেখে প্রযুক্তি নিয়ে কিশোরদের কৌতূহল বাড়ত। আর ‘মিস্টার বিন’ তো কোনো সংলাপ ছাড়াই হাসিয়ে কুটিকুটি করত।

‘এক্স-ফাইলস’ আবার ভয় আর রহস্যের নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল। রাতে একা ঘরে যেতে ভয় পেলেও পরের পর্বটা কিন্তু কোনোভাবেই মিস করা যাবে না—এটাই ছিল অবস্থা!

তখন টিভি মানেই ছিল পারিবারিক আড্ডা

আজকের মতো হাতে স্মার্টফোন নেই, একসঙ্গে শত শত চ্যানেল নেই, নেই নেটফ্লিক্স-ইউটিউবের অফুরন্ত ভান্ডার। একটি অনুষ্ঠান দেখতে হলে অপেক্ষা করতে হতো পুরো এক সপ্তাহ।

এই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো অন্যরকম আনন্দ।

পরদিন স্কুলে বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা, পাড়ার আড্ডায় প্রিয় চরিত্র নিয়ে তর্ক, কে বেশি শক্তিশালী—সিন্দাবাদ নাকি টিপু সুলতান—এমন প্রশ্ন নিয়েও চলত বিতর্ক!

আর সবচেয়ে বড় কথা, তখন বিনোদন ছিল অনেকটা সম্মিলিত আনন্দ। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে টিভি দেখত। কারও বাড়িতে টিভি থাকলে প্রতিবেশীরাও সেখানে হাজির হতেন। একটি পর্দার সামনে বসেই তৈরি হতো কত গল্প, কত বন্ধুত্ব, কত স্মৃতি।

আজ বিনোদনের অভাব নেই; বরং এত বেশি যে কী দেখব, সেটাই অনেক সময় বড় প্রশ্ন। কিন্তু নব্বইয়ের সেই সময়ে একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান দেখার জন্য যে অপেক্ষা, উত্তেজনা আর আনন্দ ছিল—সেটি আর ফিরে আসেনি।

তাই আজও কেউ যদি বলে, ‘আলিফ লায়লা দেখেছ?’—নব্বইয়ের প্রজন্মের অনেকের চোখে তখন একসঙ্গে ভেসে ওঠে সেই পুরোনো টিভি, শুক্রবার রাত, পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসে থাকা আর পর্দায় ভেসে ওঠা সেই চেনা জাদুর দুনিয়া।

সময় বদলেছে, বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে—কিন্তু বিটিভির সেই দিনগুলোর স্মৃতি এখনো অনেকের কাছে অমলিন।


Loading...
Loading...

বিনোদন- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: