বিয়ের নিবন্ধন সহজ করতে এবার অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে চীন। সরকারি কার্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে হাসপাতাল, ব্যাংক, বিমানবন্দর, মেট্রো স্টেশন এমনকি নাইটক্লাবেও চালু করা হয়েছে বিয়ের নিবন্ধনের সুযোগ।
সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য তরুণদের বিয়েতে উৎসাহিত করা এবং নিবন্ধনপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা। তবে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। অনেকের প্রশ্ন—বিয়ের নিবন্ধনের জায়গা সহজলভ্য না থাকার কারণেই কি তরুণরা বিয়ে থেকে দূরে থাকছেন?
সম্প্রতি চীনের শানদং প্রদেশের জিবো শহরের লিনজি জেলার একটি মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালে চালু করা হয়েছে বিয়ের নিবন্ধন সেবা। গত ২০ আগস্ট দেশটির ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে পরিচিত ছিসি উৎসবের দিন এ সেবা চালু করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একই জায়গায় বিয়ের নিবন্ধন, বিয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সন্তান নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শের ব্যবস্থা থাকায় নবদম্পতিদের সময় ও ঝামেলা কমবে।
ব্যাংকেও মিলছে বিয়ের সনদ
হাসপাতালের পাশাপাশি ব্যাংকেও চালু হয়েছে বিয়ের নিবন্ধন। চলতি আগস্টে উত্তর চীনের তিয়ানজিনে চায়না পোস্টাল সেভিংস ব্যাংকের একটি শাখায় এই সেবা চালু করা হয়। দেশটির কোনো ব্যাংকে বিয়ের নিবন্ধন সেবা চালুর ঘটনা এটিই প্রথম।
এদিকে দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংঝু বাইয়ুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও চালু হয়েছে বিয়ের সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চালু হওয়া এই উদ্যোগে নিবন্ধনের পাশাপাশি নবদম্পতিদের বিমানবন্দরের পর্যবেক্ষণ ডেকে বিনা মূল্যে যাওয়ার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
মেট্রো স্টেশন থেকে নাইটক্লাবেও বিয়ে!
চীনে বিয়ের নিবন্ধন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের মে মাসে। নতুন নিয়মে দম্পতিরা নিজেদের হুকৌ বা পারিবারিক নিবন্ধনের এলাকার বাইরে গিয়েও বিয়ে নিবন্ধন করতে পারছেন। একই সঙ্গে নিবন্ধনের সময় হুকৌ বই সঙ্গে রাখার বাধ্যবাধকতাও তুলে নেওয়া হয়।
এরপর সরকারি বেসামরিক কার্যালয়ের বাইরেও বিভিন্ন স্থানে নিবন্ধনকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ শুরু হয়। পর্যটনকেন্দ্র, পার্ক, মন্দির ও মেট্রো স্টেশনেও বিয়ের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হয়।
বেইজিং ও নানজিংয়ের কয়েকটি শতাব্দীপ্রাচীন মন্দিরে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বিয়ের নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আনহুই প্রদেশের হেফেইয়ে একটি মেট্রো স্টেশনেও চালু হয়েছে বিয়ের নিবন্ধন সেবা।
আর সাংহাইয়ে তো আরও ব্যতিক্রমী ঘটনা। সেখানে একটি নাইটক্লাব স্থানীয় বেসামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে ক্লাবের ভেতরেই বিশেষভাবে বিয়ের সনদ দেওয়ার আয়োজন করেছে।
৫০০টির বেশি নিবন্ধনকেন্দ্র
চীনের বেসামরিক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশটিতে প্রচলিত বেসামরিক কার্যালয়ের বাইরে ৫০০টির বেশি বিয়ের নিবন্ধনকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৩০০টির বেশি উন্মুক্ত স্থানকে বিয়ের সনদ দেওয়ার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এসব উদ্যোগে বিয়ের সংখ্যা সাময়িকভাবে বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে সেই প্রবণতা ধরে রাখা যায়নি।
গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশজুড়ে ১৬ লাখ ১০ হাজার দম্পতি বিয়ে নিবন্ধন করেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
পুরো ২০২৫ সালে চীনে বিয়ের নিবন্ধন হয় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৬ লাখ ৫৭ হাজার বেশি।
তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আবার বিয়ের নিবন্ধন কমেছে। এ সময়ে ৩২ লাখ ৮০ হাজার দম্পতি বিয়ে নিবন্ধন করেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
‘নিবন্ধনের জায়গার অভাবেই কি বিয়ে হচ্ছে না?’
সরকারের এমন উদ্যোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ উদ্যোগটিকে স্বাগত জানালেও অনেকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন।
একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মানুষ কি বিয়ে করে না, কারণ তারা নিবন্ধনের জায়গা খুঁজে পায় না?’
আরেকজন ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘বেসামরিক কর্তৃপক্ষের উচিত এভারেস্টের চূড়ায়ও বিবাহবিচ্ছেদের সেবা চালু করা।’
তরুণদের বিয়ে না করার পেছনে নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার জটিলতার চেয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
এক ব্যবহারকারীর ভাষ্য, ‘তরুণদের বিয়েতে বাধা জটিল প্রক্রিয়া নয়; বরং আগামী কয়েক দশকের জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি হওয়ার আত্মবিশ্বাসের অভাব।’
আরেকজনের মতে, বিয়ের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কার কারণে তরুণদের একটি অংশ এখন বিয়েকে জীবনের অপরিহার্য ধাপ হিসেবে দেখছেন না।
ফলে হাসপাতাল থেকে ব্যাংক, বিমানবন্দর থেকে নাইটক্লাব—বিয়ের নিবন্ধনকে যতই সহজ ও আকর্ষণীয় করা হোক না কেন, চীনের তরুণদের বিয়েতে উৎসাহিত করতে শুধু নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করাই যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট