সরকারের প্রথম ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা এখন কেবল তাত্ত্বিক ইশতেহার বা আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চিহ্নিত অলিগার্কদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা এবং তাদের কুক্ষিগত সম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনাই হবে সরকারের সদিচ্ছার আসল পরীক্ষা। অলিগার্কদের পুনর্বাসন নয়, বরং তাদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য সমান সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারলেই অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ সফল হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং সময়ের দাবি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গত ২২ আগস্ট ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য এবং বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে এই ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ ইতিবাচক একটি বার্তা দিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘রাজনৈতিক গণতন্ত্র যথেষ্ট নয়। আমার অর্থনীতিতে গণতন্ত্র যদি আমি করতে না পারি, রাজনৈতিক গণতন্ত্র আমাদের সফল হতে পারে না। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ যেন দেশের অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে।’ ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ উচ্চাভিলাষী হলেও অসম্ভব নয়; তবে এর জন্য প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা অলিগার্ক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য চূর্ণ করা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘এত মানুষের আত্মত্যাগের পর মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এক সময় জনগণের অধিকার, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও ভোটাধিকার ছিল না। সাধারণ মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে চলে গিয়েছিল।’
তথ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ব্যাংক খাত, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং মেগা প্রকল্পগুলো গুটিকয়েক শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবজায় জিম্মি হয়ে আছে। যখন ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজার মাত্র ৪-৫ জন আমদানিকারকের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন তাকে কোনোভাবেই মুক্তবাজার বা গণতান্ত্রিক অর্থনীতি বলা যায় না। এই অলিগার্করা শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। ফলে সাধারণ উদ্যোক্তা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। ১৪ শতাংশ ব্যাংক ঋণের বোঝা নিয়ে একজন প্রকৃত ব্যবসায়ী যখন হিমশিম খাচ্ছেন, তখন রাজনৈতিক প্রভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পাচার বা খেলাপি করার সংস্কৃতি অর্থনীতির মেরুদন্ড ভেঙে দিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ খেলাপি ঋণ আদায়, তদারকি জোরদার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে (বাস্তবায়ন ও তদারকি) জিইডির ওই প্রতিবেদনে পাঁচ বছর মেয়াদি সমন্বিত কৌশলগত রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষি কার্ড’ বা ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’-এর মতো কর্মসূচিগুলো প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রশংসনীয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু মূলধারার অর্থনীতিতে সংস্কার না আনলে এই ক্ষুদ্র সুবিধাগুলো দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে না। প্রকৃত অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাও অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগের অর্থের জোগান দিতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা জরুরি। সরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করলে সাধারণ মানুষের মালিকানা ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং অহেতুক মন্ত্রণালয় বা প্রশাসনিক কাঠামো কমিয়ে আনার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ধার করে ঘি খাওয়ার যে সংস্কৃতি ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে স্বনির্ভরতার পথে হাঁটতে হবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি ও প্রবিধান সংক্রান্ত সংস্কারগুলো সরাসরি পরিচালনা করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি সংশোধনের কাজটি সমন্বয় করবে। প্রস্তাবিত এই সংস্কারের গতি ও ফলাফল পরিমাপ করা হবে মূলধনের পর্যাপ্ততা, তারল্য, সম্পদের গুণগত মান এবং আমানতকারীদের আস্থার সূচক দিয়ে। প্রতিবছর সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে এবং ২০২৮ অর্থবছরে গিয়ে একটি মধ্যবর্তী মূল্যায়ন (মিড-টার্ম রিভিউ) পরিচালনা করা হবে। পুনর্গঠন ছাড়া বিকল্প নেই। শুধু ঋণ বাড়িয়ে বর্তমান সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতকে পুনর্গঠন করতে হলে রাইট-অফ (ঋণ অবলোপন) এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে আগে আর্থিক স্থিতি বা ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে হবে। এতে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমলে তারা পরবর্তীতে এসএমই, কৃষি ও শিল্প খাতের মতো উৎপাদনশীল জায়গায় নিরাপদে ঋণ দিতে পারবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশের অর্থনীতি ঠিক করতে হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে হবে। পাশাপাশি পেশাদারত্বের ভিত্তিতে ব্যাংক খাত চালাতে দিতে হবে। তাহলে ব্যাংকগুলো আবার অর্থায়ন শুরু করবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে; যা এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য জরুরি।