রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্যের একপর্যায়ে কয়েকবার কেঁদে ফেলেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরে সহকর্মীদের কাছে ক্ষমা চান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সংসদ সদস্যদের কাছে ভোট চান। একই সভায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় এমপিদের ফখরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
বুধবার (১৯ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেলা দুইটায় শুরু হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা চলা সভায় সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান।
সভা সূত্রে জানা যায়, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির স্বাগত বক্তব্যের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য দেন। শুরুতেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এ সময় প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের কথা স্মরণ করে ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কোনো ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকলে কিংবা অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
তিনি বলেন, দল তাঁকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও সেই সম্মান রক্ষা করবেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও অঙ্গীকার করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পেলে দলীয় সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে সবার কাছে দোয়া চান মির্জা ফখরুল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য দলীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, বক্তব্যের সময় চার থেকে পাঁচবার কেঁদে ফেলেন ফখরুল। এতে বৈঠকে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এর আগে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
রিজভী বলেন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। মনোনয়ন পাওয়ার পর ফখরুল বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যের পদ ছেড়েছেন বলেও জানান তিনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৯ সালে দলের জাতীয় কাউন্সিলের পর তিনি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব হন।
এর আগে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ওই সময় কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন ফখরুল। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সভায় মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। দলের কঠিন সময়ে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কখনো হাল ছাড়েননি বলে উল্লেখ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে দলীয় সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
তারেক রহমান বলেন, অনেক ত্যাগ ও মূল্য দেওয়ার পর দল আজকের অবস্থানে এসেছে। দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও দলীয় সংসদ সদস্যদের সতর্ক করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া হওয়ায় এটি চ্যালেঞ্জিং হবে।
নিজ নিজ এলাকায় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের দূরত্ব তৈরি হলে তা দ্রুত কমানোর নির্দেশ দেন তিনি। দলীয় ঐক্যে কোনো ধরনের বিভেদ সৃষ্টি না করারও আহ্বান জানান।
গত সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, দল-সমর্থিত প্রার্থীর বাইরে গিয়ে কেউ যেন বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করেন। স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের প্রার্থী করে তাঁদের বিজয়ী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার নিয়ম ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের ধারণা দেন এবং মির্জা ফখরুলের পক্ষে ভোট চান।
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ভোট দেবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তাঁর বর্তমান সংসদীয় আসনটি আইন অনুযায়ী শূন্য হবে।
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।