বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণের পর থেকে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। এবার শেষ হচ্ছে অপেক্ষার প্রহর। আগামীর নেতৃত্বের জন্য তৈরি করা তালিকা এখন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টেবিলে রয়েছে। যে কোনো সময় এই কমিটি ঘোষণা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। নতুন কমিটিতে শীর্ষপদ পাওয়ার জন্য ১ ডজন পদপ্রত্যাশী লবিং-তদবির করলেও দলের দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয়, কারানির্যাতিত ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় এবং বর্তমানে ছাত্রত্ব রয়েছে এমন ছাত্রনেতাদের থেকেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।
নতুন কমিটি ঘোষণার প্রাক্কালে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছেন ছাত্রদলের বর্তমান শীর্ষ পাঁচ নেতা। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বাধীন এই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তারেক রহমানের দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়। বৈঠকে তারেক রহমান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সংগঠনের গতিশীলতা ধরে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দিতে তিনি বর্তমান নেতাদের মূল দলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। এই সাক্ষাতের পরপরই গতকাল শুক্রবার রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির ঘোষণা করেন, ছাত্রদলের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আজই তাদের দায়িত্ব পালনের শেষ দিন। এই বিদায়ী বার্তার পর নতুন কমিটি ঘোষণার বিষয়টি এখন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লবিং-তদবিরে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের দুই বছরের মেয়াদ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার পর থেকেই নতুন কমিটিতে পদ পেতে লবিং ও তদবির শুরু হয়। তবে গত কয়েকদিনে এই তৎপরতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংগঠনের শীর্ষ দুই পদ অর্থাৎ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য পদপ্রত্যাশীরা এখন শেষ মুহূর্তের দৌড়ঝাঁপ করছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই তারা নিয়মিত গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয় এবং নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন। সিনিয়র নেতাদের মন জোগাতে এবং নিজেদের সাংগঠনিক দক্ষতা ও বিগত দিনের ত্যাগের কথা তুলে ধরতে পদপ্রত্যাশীরা সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দলীয় কর্মসূচিতেও শোডাউনের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতির জানান দিচ্ছেন। বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কিংবা ক্যাম্পাসে কর্মী-শিক্ষার্থীদের সাথে আড্ডায় জনপ্রিয়তা প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
আলোচনায় ১ ডজন ছাত্রনেতা: ছাত্রদলের আগামীর হাল ধরতে বর্তমানে অন্তত এক ডজন নেতার নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য আলোচনায় থাকা উল্লেখযোগ্য ছাত্রনেতারা হলেন: বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, সহ-সভাপতি এইচ এম আবু জাফর, সহ-সভাপতি মোঃ মনজুরুল আলম রিয়াদ, সহ-সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েল, সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, সহ-সভাপতি কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামিম আকতার শুভ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও ঢাবির সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক।
সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে নিয়ে আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং বর্তমানে এম ফিলে অধ্যয়নরত রয়েছেন। ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে ঢাবি ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের হামলায় ডান হাত ভেঙে যায়। ২০২৩ সালের নয়াপল্টন বিএনপির সমাবেশে পুলিশ কনস্টেবল আমিরুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে টানা ১৯ দিনে রিমান্ডে নির্যাতিত হন। আমান গতানুগতিক ছাত্ররাজনীতি ধারা পাল্টিয়ে মেধাভিত্তিক রাজনীতি করতে চান।
কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এইচ এম আবু জাফর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি এর আগে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং এস এম হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি পরিবেশ সুরক্ষাসহ শিক্ষার্থীবান্ধব নানা কর্মকাণ্ডে সুনাম কুড়িয়েছেন। ভোরের ডাককে তিনি বলেন, আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমান যে কমিটি করবেন, আমরা তাই মেনে নেব। প্রত্যাশা করছি, যারা দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিল, তাদের মধ্য থেকেই কমিটি হবে।
দুই দফায় ১৪৮ দিন কারাভোগ করেছেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মোঃ মনজুরুল আলম রিয়াদ। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে। তিনি এর আগে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং অমর একুশে হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ভোরের ডাককে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমল থেকে সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই ছাত্রদলের শীর্ষ পদে আসীন হতে দেখেছি। এবারও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার দূরদর্শী চিন্তাধারা থেকে দক্ষ, ত্যাগী, কারানির্যাতিতদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচন করবেন। তিনি বলেন, আমার সাথে ঢাকার সকল ইউনিটের নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে। আমি পলিসিভিত্তিক ইতিবাচক রাজনীতির কালচার তৈরি করতে চাই।
সহ-সভাপতি এবিএম ইজাজুল কবির রুয়েলের রয়েছে ঈর্ষণীয় একাডেমিক ফলাফল। অনার্সে ৩.৬২ ও মাস্টার্সে ৩.৭৮ সিজিপিএ অর্জন করেন তিনি। ৮ মামলায় তিনবার কারাবরণ করা এই ছাত্রনেতাও সংগঠনের দুর্দিনে বারবার নিজের সাহসের প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল। আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচন বানচালসহ নানা অভিযোগে ৭ মামলার আসামি হন। ৪ বার কারাবরণে একাধিকবার রিমান্ডে থেকেছেন। নানা সামাজিক কাজ ও রমজানে সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে ইফতার করিয়ে সুনাম কুড়িয়েছেন। গণতান্ত্রিক সকল আন্দোলনে ছিলেন অগ্রভাগে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতেরও রয়েছে বিগত সময়ে কারাবাস ও নির্যাতনের ইতিহাস। এর আগে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিষ্ঠা করা বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় শীর্ষ পদে নেতা হয়নি। জিয়া উদ্দিন বাসিত এখানকার একমাত্র প্রার্থী হওয়ায় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের সমর্থন পাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের রাজপথের আন্দোলন, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি বিভিন্ন মহলে সুনাম কুড়িয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। ছাত্রশিবিরসহ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নিয়মিত তার সমালোচনা করেছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস ও সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আলোচনায় রয়েছেন।
সহ-সভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ছিলেন। সেই নির্বাচনে অনিয়মের নানা অভিযোগ তুলে নিয়মিত প্রতিবাদ করেন। ছাত্রদলের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে ২৮ অক্টোবরের বিএনপির মহাসমাবেশের পরে গুমের শিকার হয়েছেন।
ত্যাগী ও শিক্ষার্থীবান্ধব ছাত্রনেতাদের অগ্রাধিকার: বিএনপির হাইকমান্ড সূত্রে জানা গেছে, এবারের কমিটি গঠনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি নজরদারি করছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলকে একটি আধুনিক ও মেধাবী সংগঠনে রূপান্তর করতে তিনি বদ্ধপরিকর। এবারের নেতৃত্বে আসার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। প্রথমত, ত্যাগী নেতৃত্ব: যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, বারবার হামলা-মামলা ও কারাবরণের শিকার হয়েছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীবান্ধব ও নিয়মিত ছাত্র: সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্রদলকে জনপ্রিয় করতে নিয়মিত এবং প্রকৃত ছাত্রদের দিয়েই কমিটি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতির বাইরে গিয়ে যারা শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে কাজ করতে পারবে, তারাই নেতৃত্বে আসবেন। তৃতীয়ত, দক্ষ-মেধাবী: রাজপথের লড়াইয়ের পাশাপাশি যারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও গঠনমূলক রাজনীতিতে দক্ষ এবং যাদের একাডেমিক ফলাফল ভালো, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল ভোরের ডাককে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এবার একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য কমিটি হবে। দলীয় ছাত্রসংগঠনে শীর্ষপদ প্রত্যাশীদের দলীয় অ্যাক্টিভিটি দেখা হবে। একই সাথে শিক্ষার্থীদের সাথে যাদের সুসম্পর্ক রয়েছে, নিয়মিত ছাত্র ও কর্মীবান্ধব ছাত্রনেতাদের দিয়েই কমিটি করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, ছাত্রদলের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনকে নতুনভাবে সাজানো বিএনপির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের কর্মীদের অনুভূতি এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার ভারসাম্য বজায় রেখে কমিটি দিতে পারলে তা বিএনপির সামগ্রিক রাজনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।