মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা নিঝুম দ্বীপের সৈকতের বালিতে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ভারী খনিজের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। সাম্প্রতিক এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন (এক্সআরডি) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সৈকতের মোট পলির প্রায় ২৫ শতাংশই টোটাল হেভি মিনারেলস (টিএইচএম)।
গবেষকদের মতে, নিঝুম দ্বীপের বালিতে থাকা এই বিপুল খনিজ সম্পদ যথাযথভাবে আহরণ ও ব্যবহার করা গেলে দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
যেসব মূল্যবান খনিজ পাওয়া গেছে
গবেষণাগারে বালির নমুনা পরীক্ষা করে সিলিম্যানাইট, গার্নেট (অ্যালমান্ডিন), জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট, জেনোটাইম, মোনাজাইট ও কায়ানাইটের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যামফিবোল ও পাইরক্সিন গ্রুপের বিভিন্ন খনিজও পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, খনিজের চৌম্বকীয় অংশে এনস্টাটাইটের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি। এছাড়া বায়োটাইট, পারগাসাইট, মাসকোভাইট, সোডালাইট, ডায়োপসাইড, ম্যাগনেসাইট, স্পিনেল, ট্রেমোলাইট, অ্যানোরথাইট, ম্যাগনেসিওফেরাইট, টাইটানাইট, পেরিক্লেস, স্পোডুমিন ও হর্নব্লেন্ডের মতো বিভিন্ন খনিজ উপাদানও শনাক্ত হয়েছে।
আধুনিক প্রযুক্তিতে খনিজ শনাক্তকরণ
বালিতে বিভিন্ন ধরনের খনিজ একসঙ্গে মিশে থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে সেগুলো আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন। এ কারণে গবেষণায় জাপানে তৈরি অত্যাধুনিক ‘স্মার্টল্যাব এসই (রিগাকু)’ এক্স-রে ডিফ্র্যাক্টোমিটার ব্যবহার করা হয়।
পরে ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং খনিজের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণে ‘এক্স’পার্ট হাই স্কোর প্লাস’ সফটওয়্যারের অটো-ম্যাচিং ডেটা ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে নমুনায় থাকা বিভিন্ন খনিজের তালিকা তৈরি করেন গবেষকরা।
শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনা
জিরকন, রুটাইল ও ইলমেনাইটের মতো ভারী খনিজ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সিরামিক, রং, ওয়েল্ডিং রড ও ধাতব শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে এসব খনিজের চাহিদা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিঝুম দ্বীপের সৈকতে পাওয়া ভারী খনিজ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হলে দেশের শিল্পে কাঁচামালের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানিরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশের নদ-নদীর বালিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সম্ভাবনা যাচাইয়েও গবেষণা চালানো হয়েছে। দেশের আটটি প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রায় ৫ হাজার ৪৮১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পরিচালিত ওই জরিপে ৬ হাজার ৬০০টির বেশি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৮০০টির বেশি নমুনার পেট্রো-মিনারেলজিক্যাল, রাসায়নিক ও ভৌত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষকদের এসব অনুসন্ধান বাংলাদেশের বালু ও পলিতে থাকা খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এসব সম্পদ উত্তোলনের আগে পরিবেশগত প্রভাব, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: এমডিপিআই