প্রতিবছরই দেশের মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছে। তাদের অন্তত ৬০ শতাংশই পড়াশোনা শেষ করে আর দেশে ফিরছে না। চাকরির অভাব, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় তারা দেশ ত্যাগ করছে। আবার উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার সুযোগ, চাকুরিতে উচ্চ বেতন এবং স্থায়ী বসবাসের আকর্ষণে তারা বিদেশের মাটিতেই ক্যারিয়ার গড়ছেন। এতে দেশ থেকে ভয়াবহভাবে মেধা পাচার (ব্রেন ড্রেন) হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক দশকের ব্যাবধানে দ্বিগুণ বাড়ছে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, ২০১৩ সালে এই সংখ্যা সীমিত থাকলেও ২০২৩ সালে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজারে। শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই বিদেশের শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকারও বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, অতীতে প্রধানত স্নাতকোত্তর বা পিএইচডির জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও বর্তমানে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক পর্যায়েই শিক্ষার্থীরা দেশ ছাড়ছেন। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কলেজগুলোতে ইংরেজি মাধ্যমের প্রতি ঝোঁক এবং উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা এর বড় প্রমাণ।
কেন ফিরছেন না মেধাবীরা? শিক্ষিত তরুণদের দেশবিমুখ হওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় কারণই দায়ী। অভ্যন্তরীণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, গবেষণার সীমিত সুযোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারদের হার প্রায় ৩১ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা সরকারি চাকরিতে আবেদন করলেও মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, বিদেশের নামি প্রতিষ্ঠান যেমন- গুগল, আমাজন, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যাপলে বাংলাদেশের তরুণরা অত্যন্ত সফলতার সাথে কাজ করছেন। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি গবেষকদের মতে, এটি কেবল উচ্চ বেতনের বিষয় নয়, বরং পেশাগত নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনমানের নিশ্চয়তা তাদের সেখানে থাকতে বাধ্য করছে। যুক্তরাজ্যে কর্মরত সাইদুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত মো. ইউসুফ জানান, বাংলাদেশে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের পরিবেশ ও বেতনকাঠামো মানসম্মত না হওয়ায় তারা বিদেশের মাটিতেই ভবিষ্যৎ দেখছেন। পেশাগত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব তাদের দেশে ফেরার পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার অভাব: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি তরুণদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি করেছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৬০.৫ শতাংশ তরুণ দেশের সব ব্যর্থতার জন্য রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের দায়ী মনে করেন। জুলাই আন্দোলন ও এর পূর্ব-পরবর্তী সময়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর মৃত্যু, নিত্য নতুন দূর্ঘটনা, নিরাপত্তার হুমকিসহ নানা আতঙ্কে অভিভাবকরা সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করছে। অনেক সময় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশের কারণে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকির মুখে পড়েন, যা তাদের দেশ ছাড়ার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে কাজ করে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশপ্রেমের অভাব এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ মেধাবীদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে। শাসক শ্রেণির দুর্নীতি ও লুটপাট তরুণদের মনে দেশের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে। তিনি আরও বলেন, দেশে তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা শ্রেণি বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করেছে, যার ফলে উচ্চবিত্তরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে উন্নত করার চেয়ে সন্তানদের বিদেশে পাঠানোর দিকেই বেশি মনোযোগী।
মেধা পাচারে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: অর্থনীতির ভাষায় একে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’ বলা হয়, যেখানে রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তৈরি হওয়া দক্ষ সম্পদ অন্য দেশ ভোগ করে। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও আয়ারল্যান্ডও একসময় একই সংকটে পড়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এসব দেশ সফল হয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে দিয়েছে। ভারত তার বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য আইআইটিতে রিসার্চ পার্ক এবং আকর্ষণীয় ফেলোশিপের ব্যবস্থা করেছে। চীন বিশেষ ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম ও গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশফেরতদের সুযোগ দিচ্ছে। আয়ারল্যান্ডও বহুজাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখতে পেরেছে।
বাংলাদেশেও বর্তমানে ‘ব্রেন ড্রেন’ কমিয়ে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’ বা মেধা আবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন নীতিনির্ধারকরা। সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, বাংলাদেশ যাতে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেভাবে তৈরি করতে হবে। আর উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশে যাওয়া তরুণদের ফিরে এসে দেশের সেবায় কাজের পরিবেশ তৈরি করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা চাই ‘ব্রেন ড্রেন’ বন্ধ করে এটিকে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তর করতে। প্রবাসে থাকা দক্ষ গবেষক ও একাডেমিকদের জয়েন্ট রিসার্চ ও শর্ট কোর্সের মাধ্যমে দেশের গবেষণাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সরকার মেধাবীদের দেশে ফেরাতে নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কেবল দেশপ্রেমের আহ্বান জানিয়ে মেধাবীদের ফেরানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণার স্বাধীনতা, নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং প্রতিযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনমূলক উদ্যোক্তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ও সহজ নীতিমালা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে দেশ মেধাশূন্যতার এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।