দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর তিনদিনের সফরে বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসছেন। তার এ সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
সার্জিও গোর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তিনি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূতের পাশাপাশি ভারতের মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া তার ঢাকা সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান,পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা, ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সার্জিও গোরের এবারের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরো গভীর করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় আসতে পারে।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, মার্কিন বিশেষ দূতের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও সুগম হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময়ই ভালো রয়েছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার এখন প্রতিষ্ঠিত, সেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও বেশি জোরদার হচ্ছে এবং হবে। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রতিনিধি এদেশে সফরে এলে আমরা মনে করি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীর করবে। আমরা আশা করি, এ সফরের মধ্য দিয়ে আরো নতুন কিছু বেরিয়ে আসবে।
তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বহুপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো আরা সুগম হবে। আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, মানুষে মানুষে যোগাযোগ সব আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে বলে আমি মনে করি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়া কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একটি অংশের ধারণা, মার্কিন দুতের ঢাকা সফরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশও আলোচনার বাইরে থাকবে না।
এ ব্যাপারে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মাসরুর মাওলা ভোরের ডাককে বলেন,অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, রাজনৈতিক সংলাপ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর বিভিন্ন পক্ষের মতামত জানতে আগ্রহী হতে পারেন।
সে কারণেই সরকার ও বিরোধী দলের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠককে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছি।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, দুই দেশের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করার বিষয়টি সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় এগোলেও কিছু স্পর্শকাতর ইস্যুতে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোরের এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল,যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কেবল একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করছে। একই সময়ে বাংলাদেশও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক সমানভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে কূটনৈতিক মহলের অভিমত, সফরকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা থাকলেও এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারিত হবে বৈঠকগুলোর ফলাফল এবং সফর-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে। কারণ উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফরের অনেক আলোচনা প্রকাশ্যে আসে না, বরং পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত ও দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগেই তার প্রতিফলন দেখা যায়।
সব মিলিয়ে, সার্জিও গোরের ঢাকা সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে এই সফর শুধু বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।