সংবিধান সংশোধন, না সংবিধান সংস্কার—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিরোধী জোটের নেতারা ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ৪৮টি প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতিতে সীমিত সংশোধন নয়; গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে একটি ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’ গঠন করে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
অন্যদিকে বিএনপি বিদ্যমান সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দলটির মতে, সংবিধানে আলাদা কোনো ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’-এর বিধান নেই। ফলে সংবিধানের নির্ধারিত অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনাই সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ।
এই ভিন্নমুখী অবস্থানের মধ্যেই শনিবার সিলেটে ১১-দলীয় জোটের সমাবেশ থেকে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন জোরদারের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সমাবেশে জামায়াত, এনসিপিসহ জোটের নেতারা বলেন, সরকার যদি জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ না নেয়, তাহলে ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হলে সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ও স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
সিলেটের সমাবেশে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সারা দেশে ঘুরেছি। মানুষের একটাই চাওয়া—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা হোক। এটি নিয়ে কোনো দানাই-পানাই চলবে না। আমাদের কথা পরিষ্কার, গণভোটকে আমরা অপমান করতে দেব না। সরকার যদি জনগণের রায় না মানে, তাহলে এ দেশের মানুষ জানে কীভাবে নিজেদের দাবি আদায় করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার জন্য ডাক আসবে। ঘরে ঘরে লড়াইয়ের দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হবে।’
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে প্রচার চালালেও নির্বাচনের পর ৭০ শতাংশ জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটছে না। তিনি বলেন, ‘এখনও হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। তবে প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় এমন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রচলিত সংসদীয় সংশোধন কমিটির পরিবর্তে ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’-এর মাধ্যমে রূপান্তরমুখী পরিবর্তন নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। তাদের অভিযোগ, সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকারের গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি প্রকৃত সংস্কারের পরিবর্তে সীমিত সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা জুলাই জাতীয় সনদের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে বিএনপি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, সংবিধানের যেকোনো পরিবর্তন কেবল নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই বৈধ ও টেকসই হতে পারে।
সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা বরাবরই সংবিধান সংশোধনের কথা বলেছি, সংবিধান সংস্কারের কথা কখনোই বলিনি। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আমাদের রয়েছে। তবে তা সংবিধানের কাঠামো ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হবে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিরোধী পক্ষ এ ইস্যুতে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
সরকার এরই মধ্যে গত ১৩ জুলাই ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি’ গঠন করেছে। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিব রহমান, মোহাম্মদ নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক রুবেল এবং মোহাম্মদ অলিউল্লাহ।
প্রথমে ১৭ সদস্যের কমিটি করার পরিকল্পনা থাকলেও জামায়াত ও এনসিপি প্রতিনিধি না দেওয়ায় বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যকে নিয়ে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান প্রশ্নে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের এই নীতিগত বিভাজন আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ধরনের বিতর্ক ও সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। একদিকে সংসদীয় পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে সরকার ও বিএনপি, অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে নতুন সাংবিধানিক কাঠামো গঠনের দাবিতে বিরোধী জোটের আন্দোলনের ঘোষণা—দুই পক্ষের এই ভিন্ন অবস্থান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন মোড়ে নিয়ে যেতে পারে।