তিন সরকারের আমলে দায়িত্ব পালন করছেন গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিভিন্ন সময় তার পদত্যাগ বা অপসারণ নিয়ে বেশ গুঞ্জন ছিল। তবে এবার সেই গুঞ্জন সত্যি হতে চলেছে। যে কোনো মুহূর্তে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যে থাকছেন না সেটি নিশ্চিত করেছেন বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা।
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি সম্মানজনক বিদায় নিয়ে চলে যেতে চান। বঙ্গভবনের এই কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রপতির শরীররটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। ওপেন হার্ট সার্জারি করিয়েছেন। উনি সুন্দরভাবে, সম্মানজনকভাবে চলে যেতে চান, উনি সব সময় এটা চেয়েছেন। সরকার হয়তো সেটা বিবেচনা করছে।
তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া সরকারের নিজস্ব পরিকল্পনা আছে। সে অনুযায়ী এগোবে। আর রাজনৈতিক সরকার তো রাজনৈতিক পরিকল্পনা করবে।
শারীরিক সমস্যার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন বলে জানান বঙ্গভবনের এই কর্মকর্তা।
তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হসপিটালে ওপেন হার্ট সার্জারি করেন।
এরপর যুক্তরাজ্যে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলাকালে ১২ মে রাষ্ট্রপতির হৃদযন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লক শনাক্ত হওয়ায় জরুরিভিত্তিতে সফলভাবে এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট (রিং) স্থাপন করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের পর এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর।
এদিকে বিএনপি ও সরকার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, পদত্যাগ করতে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী : শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারবেন। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারবেন। সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। তিনি চাইলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র দিতে পারবেন। এর বেশি কিছু জানা নেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া : ৯০ দশকের আগে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। ১৯৯১ সালে সংসদীয়-ব্যবস্থা চালুর পর আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন এমপিদের পরোক্ষ ভোটে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর।
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।
মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা অভিসংশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়ে থাকে। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ৩৫ বছরের বেশি ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো যোগ্য হতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ হতে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।
পদ শূন্য হয় কীভাবে : সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, পদত্যাগ, শারীরিক অসামর্থ্য বা অভিশংসন হলে এই পদ শূন্য হয়। এ ছাড়া গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের কারণেও রাষ্ট্রপতি অপসারিত হতে পারেন। আর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার।
উল্লেখ্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তারা এ নিয়ে বঙ্গভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলন করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক কারণে তাকে সরাতে রাজি হয়নি। তাছাড়া দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপিও তখন এ বিষয়ে সায় দেয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই দাবি স্তিমিত হয়ে যায়। এখন আবারও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা জোরালো হয়েছে।
২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অধীনেই শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকার-প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একাধিকবার আলোচনায় ওঠে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কিংবা অপসারণের বিষয়টি। মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে মাঝে-মাঝে উত্তপ্ত হয়েছে রাজপথ। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বহাল থাকেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞাপন ও নিয়মিত রুটিন কাজ ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না। সম্ভাব্য অনাকাক্সিক্ষত আচরণ এড়াতে রাষ্ট্রীয় অনেক আচার অনুষ্ঠানেও তার উপস্থিতি ছিল না।
রাষ্ট্রীয় দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন অপাঙক্তেয়। এমনকি জাতীয় ঈদগাহেও তিনি নামাজ পড়তে যেতে পারেননি।