মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা এবং টানা ভারী বর্ষণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে খাগড়াছড়ি ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
পাহাড়ি ঢল, ভারী বৃষ্টিপাত এবং নদী-ছড়ার পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় একদিকে যেমন বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বেড়েছে পাহাড়ধসের আশঙ্কা। বিভিন্ন স্থানে সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে সংকট। একই সঙ্গে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় ডাইভার্ট হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
খাগড়াছড়িতে বাড়ছে পাহাড়ধসের শঙ্কা : খাগড়াছড়িতে টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে জেলার নদী, ছড়া ও খালের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। মুসলিমপাড়া, উত্তর গঞ্জপাড়া, মেহেদীবাগের একাংশ, মহালছড়ির মাইসছড়ি বাজার এবং দীঘিনালা-লংগদু সড়কে জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
প্রশাসন জানিয়েছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে ধাপে ধাপে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
লোহাগাড়ায় বন্যা ও পাহাড়ধসের সতর্কতা : চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে আমিরাবাদ, পুঁটিবিলা ও আধুনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি বেড়ে গেছে। কোথাও কোথাও নদীভাঙনের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন পাহাড় ও টিলায় বসবাসরত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবদের মাইকিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল চালু করা হয়েছে।
ইউএনও মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ জানান, পুলিশ, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। এখনো পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি, তবে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে পারে।
হাটহাজারী-অক্সিজেন সড়ক পানির নিচে : টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে এসে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ হাটহাজারী-অক্সিজেন সড়কের বড়দিঘি পাড় এলাকায় কোমরসমান জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। এতে দুই দিকেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পানিতে ডুবে বিকল হয়ে পড়ে বহু সিএনজিচালিত অটোরিকশা। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের খাল ও ড্রেন দখল ও সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় প্রতি বর্ষাতেই একই চিত্র দেখা দেয়। স্থায়ী সমাধানে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়ক উঁচু করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
পানিতে তলিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : ভারী বর্ষণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বোয়ালখালীর বাসিন্দারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলা হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জরুরি বিভাগ, ল্যাব ও প্রশাসনিক কক্ষের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম ও নথিপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের চরম ভোগান্তির মধ্যে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পশ্চিম গোমদণ্ডী, পশ্চিম শাকপুরা, ঘোষখীল ও কধুরখীলসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
দুই দিন বিদ্যুৎহীন বোয়ালখালী : লাগাতার বর্ষণে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বোয়ালখালীর অধিকাংশ এলাকা দুই দিন ধরে অন্ধকারে রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস কার্যক্রম এবং মোবাইল যোগাযোগেও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সামান্য দুর্যোগেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অথচ নিরবচ্ছিন্ন সেবার নিশ্চয়তা মিলছে না। এদিকে আরাকান সড়কে একটি গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে ফায়ার সার্ভিস দ্রুত অভিযান চালিয়ে সেটি অপসারণ করে যোগাযোগ স্বাভাবিক করে।
পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ : জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা ও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে অনেক শিক্ষার্থীকে কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতি বছর একই দুর্ভোগ হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
বিমান চলাচলেও প্রভাব : বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মঙ্গলবার অন্তত তিনটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। প্রবল বাতাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দুটি আন্তর্জাতিক এবং একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট করা হয়।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওঠানামা করছিল। ফলে দিনের প্রায় সব আগমন ও প্রস্থান ফ্লাইট ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বিত হয়েছে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি জোরদার : খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সেনাবাহিনী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে সতর্কবার্তা প্রচার, স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্ক বার্তা : দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানিয়েছে, টানা বর্ষণের ফলে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, নদী-ছড়া ও খালের পানি বৃদ্ধি এবং নগরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ভারী (৪৪-৮৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (৮৮ মিলিমিটারের বেশি) বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতিভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর নিচু এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের খাল দখল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের দুর্যোগের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। তাই তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে স্থায়ীভাবে উত্তরণ সম্ভব নয়।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, অপ্রয়োজনে পাহাড়ি এলাকায় চলাচল না করা, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালের পাদদেশে অবস্থান না নেওয়া, প্রবল স্রোতের পানি পার হওয়ার চেষ্টা না করা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়াই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।