চরম সংকটে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য

সাইদুল ইসলাম

জাতীয়

নিজেকে সুস্থ রাখতে ও জীবন বাচাতে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় পুষ্টিগুণসম্পন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য। কিন্তু গ্রাম থেকে

2026-07-02T13:52:33+00:00
2026-07-02T13:52:33+00:00
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
গ্রাম থেকে শহর
চরম সংকটে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য
সাইদুল ইসলাম
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ১:৫২ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নিজেকে সুস্থ রাখতে ও জীবন বাচাতে প্রতিদিন প্রয়োজন হয় পুষ্টিগুণসম্পন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য। কিন্তু গ্রাম থেকে শহর সর্বত্রই এর চরম সংকট চলছে। বিশেষ করে ঢাকাসহ সারাদেশের বাজারে পাওয়া চাল, ডাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ঘি, ভোজ্যেতেল, মসলা ও শিশু খাদ্যেসহ সব কিছুই অনিরাপদ। 

বর্তমানে জনসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য বিক্রি বাড়ায় অধিকাংশ কৃষক নানা ধরনের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক-কীটনাশকের ব্যবহার করছে। এমনকি জমি থেকে ফসল ঘরে তোলার আগেও বিষাক্ত রাসায়নিক স্প্রে করা হচ্ছে। এসব খাদ্য রান্নার পরও বিষমুক্ত হয় না। এতে স্বাস্থ্যকর খাবারের জায়গা আশঙ্কাজনকভাবে দখল করে নিচ্ছে পুষ্টিগুণহীন, অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর খাবার। ফলে অনিরাপদ খাবার আহরণ করে কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। 

বিশেষ করে ঘরে ঘরে কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস, ক্যানসারের মতো জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। পাশাপাশি  দেশের অধিকাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকায় এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়াও দুষ্কর। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে খাদ্য উৎপাদনের চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। এই চাপ সামাল দিতে কৃষি ব্যবস্থায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফলে পুষ্টিগুণ ও গুণমান হারাচ্ছে খাদ্য। একই সাথে পরিবেশও দূষিত হচ্ছে। এতে কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। আর ভোক্তারাও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। ফলে বর্তমানে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অপুষ্টিসহ নানা রোগে ভুগছেন।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দৈনিক ৮০ জন এবং বছরে ৩০ হাজার মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মুরগির মাংসে ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন খাবারে ধরা পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। সয়াবিন তেল, ডিমসহ নানা খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদানের সন্ধানও পাওয়া গেছে। 

জানা গেছে, জনসংখ্যার চাপ ও সীমিত ভূমি, পরিবেশগত অবক্ষয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি, বাজারে ভেজাল ও মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য কম প্রবেশগম্যতা, খাদ্য শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে মনিটরিং ঘাটতি, ভোক্তার সচেতনতার সীমাবদ্ধতা ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে। 

এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নিরাপদ খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট দিন দিন আরো বাড়ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষকরা প্রতিনিয়ত ফসলহানির ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন। তারা বাড়তি খাদ্যে উৎপাদনের প্রবল চাপ সামলাতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার করছেন ইচ্ছেমতো। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার করায় তা বিষাক্ত আকার ধারণ করছে। একই চিত্র আমিষের প্রধান উৎস মাছ ও মাংস উৎপাদনেও। প্রাণীর দ্রুত বৃদ্ধি ও রোগবালাই ঠেকাতে পোলট্রি ও মৎস্য খামারে ব্যবহার করা হচ্ছে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক। এর অবশিষ্টাংশ মানবদেহে প্রবেশ করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের সব মানবিক অধিকারের বাস্তব পূর্বশর্ত হলো তার দৈহিক অস্তিত্ব। আর দৈহিক অস্তিত্বের প্রধান শর্ত হলো নিরাপদ খাদ্য। তাই খাদ্যের অধিকার শুধু একটি সামাজিক অধিকার নয়। এটি মানুষের জীবন, সুস্থতা, মর্যাদা ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তি এবং পরস্পরের সাথে  গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় খাদ্য এবং নিরাপদ খাদ্য দুটি আলাদা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিরাপদ খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। 

পর্যাপ্ত খাদ্য থাকলেও যদি তা ভেজাল, দূষিত বা পুষ্টিমানে ঘাটতিপূর্ণ হয়, তবে তা খাদ্য হিসেবে গন্য হয় না। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্যে সব মানুষের সমান প্রবেশগম্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

এদিকে, বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১০ দশমিক ৪ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে। পুষ্টিবিষয়ক জ্ঞানের অভাব, প্রচলিত খাদ্যাভ্যাস, অবৈজ্ঞানিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রান্না এবং খাদ্যে ভেজালের কারণে পুষ্টিগত মানের অবনতি হচ্ছে। 

পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ, চর্বি ও পানির সুষম উপস্থিতি প্রয়োজন। কিন্তু সার্বিক মূল্যস্ফীতি, মজুরি স্থবিরতা, টাকার অবমূল্যায়ন, কর্মসংস্থান সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ আর্থসামাজিক চাপের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অনেকে সুষম খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না। কিন্তু যার পক্ষে যেটুকু খাবার গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে তাও নিরাপদ নয়। 

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, খাদ্যের পুষ্টিমান সম্পর্কে জানা জনগণের মৌলিক অধিকার। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যে বিদ্যমান ক্ষতিকর উপাদান সহজে চিহ্নিত করার জন্য ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। 

এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন ও কর্তৃপক্ষ থাকলেও মূল সমস্যা নীতিমালার সমন্বয় ও কঠোর প্রয়োগে। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। কৃষকদের জৈব সার ও বায়ো কীটনাশক ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে ভর্তুকি দিতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে কঠোর তদারকিও প্রয়োজন। 


  বিষয়:   পুষ্টিগুণ  খাদ্যে  সুস্থ রাখতে 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: