বাংলাদেশের মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ—এ কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, মিলেমিশে থাকাই এ দেশের মানুষের আবহমানকালের মূল্যবোধ। ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্য ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে দেশ গঠনে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, কর্ম ও দর্শনের ব্যাপক প্রসারের লক্ষ্যে শুরু হয়েছে বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬–২০২৭’-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে বছরব্যাপী এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে তিনি কবি নজরুলের সাহিত্য ও মূল্যবোধকে সরকারি অফিসের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম এই ভূখণ্ডে না হলেও তাঁর হৃদয়ের বিশাল অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশ। কবিও এ দেশের মানুষের গভীর ভালোবাসায় সিক্ত। ১৯১৪ সালে কিশোর বয়সে প্রথমবারের মতো ময়মনসিংহের ত্রিশালে এসেছিলেন তিনি। কবির স্মৃতি বিজড়িত সেই ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সরকার। পাশাপাশি ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি, কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তাঁর আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। অন্যায়, শোষণ, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শানিত অস্ত্র। প্রেম, প্রকৃতি থেকে শুরু করে ইসলামী মূল্যবোধ কিংবা শ্যামা সংগীত প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশের নামান্তর।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তাঁর রচনার মধ্যে মহিমাময় সৌন্দর্য নিয়ে বাক্সময় হয়েছে। কবি নজরুলের সৃষ্টিশীলতার মধ্যে আতিথ্য রয়েছে সকল কালের, সকল মানুষের। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি আমাদের অনুপ্রেরনা। তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রয়োজন ফুরানোর নয়।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, নজরুল গবেষক ও শিল্পীদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আবদ্ধ ঘরে বসে এই কর্মসূচি উদ্বোধন করাটা তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। আমন্ত্রণপত্রে বিভাগীয় কমিশনার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ থাকায় তিনি কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এর পরিবর্তে আমন্ত্রণ পত্রে যদি লেখা থাকতো ‘সকল বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নজরুল গবেষক, নজরুল শিল্পী, নজরুলপ্রেমীগণ ভার্চুয়ালী সংযুক্ত থাকবেন’ সেটি বরং বেশি যৌক্তিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো বলে আমার বিশ্বাস।’
তিনি আরও যোগ করেন, আমার এই উপলব্ধির কারণ হলো, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা কৃষক কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যদি বলা হয় ‘নজরুল গবেষক নজরুল শিল্পী নজরুলপ্রেমী মানুষেরা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ এটি যেমন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়না ঠিক একইভাবে একই কারণে নজরুল বর্ষ উদযাপনে ‘সকল বিভাগীয় কমিশনার, জেলা এবং নির্বাচিত ৭৪টি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ ভার্চুয়ালি সংযুক্ত থাকবেন’ কথাটিও উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তরুণ প্রজন্মকে নজরুলের নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি নজরুলের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ কিংবা ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে’ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘এই ধরনের ছড়া বা কবিতা বর্তমান প্রজন্মের জন্য আশা জাগানিয়া আলোকবর্তিকা।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কবির সাহিত্যকর্ম যেন কেবল মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের চার দেয়ালে আটকে না থাকে। কবি নজরুলের উক্তি, আমি গেলে যারা আমার পতাকা ধরিবে বিপুল বলে- সেই সে অগ্রপথিকের দল এসো এসো পথতলে’ এই চেতনা ধারণ করে তাঁর জীবনবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।
নজরুল বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নানা বিশেষণের বাইরে কবিকে ‘বাংলাদেশের মন’ হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমন বলেন, গাহি সাম্যের গান, সেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান, সেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান।
অপশক্তি বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের মানুষ আবহমান কাল ধরেই মিলেমিশে থাকতে অভ্যস্ত। বর্তমান সরকারও এমন এক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বাস করবে এবং কোনো প্রাণীই হিংস্রতার শিকার হবে না।
‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে সাহিত্য সম্মেলন, সেমিনার, সংগীতের আসর, নাট্যোৎসবসহ নানা আয়োজনের মাধ্যমে কবির সৃষ্টিকে জনপরিসরে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ডিজিটাল মাধ্যমে কবির সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারের সুযোগকেও কাজে লাগানোর আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬–২০২৭’ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ‘নজরুল বর্ষ’ উদ্যাপনের মাধ্যমে দেশে বিদেশে জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্ম নতুনভাবে মূল্যায়িত হবে।’