উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির প্রভাবে নদনদীর পানি ওঠানামা অব্যাহত থাকলেও কমছে না জনদুর্ভোগ। তিস্তার পানি কিছুটা কমলেও শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন, ঝুঁকির মুখে পড়েছে ফসলি মাঠসহ সেতু রক্ষা বাঁধ, সড়ক ও বসতি। পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, জিঞ্জিরাম, অর্জুনডারাসহ জেলার ৩২টি নদনদীর পানি দ্রুত বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা ও তীব্র ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের প্রভাবে কুড়িগ্রামে দুধকুমার নদ এরই মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, সুরমা, যাদুকাটাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বাড়ছে এবং কয়েকটি নদী বিপদ সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর প্রভাবে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে, নদীভাঙন বেড়েছে এবং স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।
স্থানীয়রা জানায়, পানির তলে শুধু বাড়িঘর নয়, এলাকার কৃষিজমি, ফসল ব্যাপকহারে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনের পর দিন পরিবার নিয়ে বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। গতকাল বুধবার অনেক পরিবার বসতঘর সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রধান নদনদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। কুড়িগ্রামের পাটেশ্বরী স্টেশনে দুধকুমার নদ বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে নদীটির পানি ৯৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
একই সময়ে নীলফামারীর ডালিয়া, রংপুরের কাউনিয়া ও লালমনিরহাটের তারাপুরে তিস্তা নদী, সিলেটের কানাইঘাটে সুরমা নদী, ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদী এবং সুনামগঞ্জের লরেরগড়ে যাদুকাটা নদী বিপদ সীমায় রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী এবং সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এ সময়ে সর্বোচ্চ ১৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে কুড়িগ্রামের পাটেশ্বরী স্টেশনে।
এছাড়া বদরগঞ্জে ৯৩ মিলিমিটার, কুড়িগ্রামে ৮২ মিলিমিটার, চিলমারী ও ডালিয়ায় ৮০ মিলিমিটার এবং লরেরগড়ে ৭৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশের পাসিঘাটে ২০৩ মিলিমিটার এবং আসামের ডিব্রুগড়ে ১০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
বর্তমানে তিস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে পানির প্রবণতা ভিন্ন থাকলেও নদীটি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। কুড়িগ্রামের বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
একই সময়ে শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের প্রধান নদীগুলো এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গোমতী, মুহুরি, সেলোনিয়া, ফেনী ও সাঙ্গু নদীর পানিও আগামী তিন দিনে বাড়তে পারে।
বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান জানান, মিয়াপাড়া ও মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ নিচু হওয়ায় কয়েকটি স্থানে বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। ফলে ইউনিয়নের ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। নদীতীরবর্তী মানুষকে সতর্ক করতে মাইকিং করা হয়েছে। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, নৌকা, শুকনো খাবার ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জানা যায়, নদী এদেশের মানুষের কাছে যেমন আশীর্বাদ, তেমনি কারো কারো জন্য আবার অভিশাপ হয়েও দেখা দেয়। নদীভাঙন নদীপাড়ের মানুষের কাছে ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ দুর্যোগ সারা বছর ধরে নানা মাত্রায় নানা গতিতে চলে।
নদীভাঙনে বসতভিটা জায়গা-জমি সব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, কবরস্থানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, নদীমার্তৃক এই দেশে নদীকে যতটা গুরুত্ব দেয়া দরকার তা কোনো সরকারই দেয় না। এ জন্য নদী আজ শুকিয়ে মরছে, দেশ মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
অন্যদিকে নদীভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। অথচ নদীভাঙন বিষয়টাকে সরকার খুব একটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বলে মনে হয় না। ভাঙন রোধে এখনো টেকসই বাঁধ নির্মাণ সম্ভব হয়নি।