দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে নতুন গতি ফিরছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে সাম্প্রতিক চীন সফরে। সফরকালে বেইজিং ও ঢাকার শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, নদী পুনরুদ্ধার, অর্থায়ন, কারিগরি সহযোগিতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। যৌথ যোগাযোগেও তিস্তা ও বাংলাদেশের অন্যান্য নদীর ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে চীন।
চীন সফরের সময় বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইং। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে ঐকমত্য হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তাও প্রত্যাশা করেন। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
এদিকে গত ২৯ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বর্তমান সরকার যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।
এই সময় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় জনমত গঠনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতেও তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান রেখেছেন। এছঅড়া তিস্তায় অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে ঘিরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনের সহযোগিতা ও সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার একসঙ্গে কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটতে পারে।
তবে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত, কারণ তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী এবং এর ব্যবস্থাপনা দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পটির অর্থায়ন বা বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি এই প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগ গ্রহণ করে, তাহলে তা কেবল অর্থনৈতিক নয়, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারত বিষয়টিকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছে।
ভারতের উদ্বেগের মূল কারণ, তিস্তা নদী দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বড় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নও তৈরি করতে পারে। তবে বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পে অংশীদার নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে তিস্তা ব্যারেজ ও মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলেছেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে চায়।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব, কারিগরি সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ব্রিফিংয়ে বলেছে, বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সহযোগিতা চায়, তাহলে চীন পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে উন্নয়ন সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
বেইজিংয়ের দাবি, তাদের সহযোগিতা কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং অংশীদার দেশের উন্নয়ন চাহিদা পূরণেই তারা কাজ করে।
তিস্তা ইস্যুতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানেও কিছু পার্থক্য রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলছে, জাতীয় স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করা হবে। অন্যদিকে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়ে আসছে এবং উত্তরাঞ্চলের পানিসংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা সমস্যার মূল চ্যালেঞ্জ কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় উত্তরাঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মহাপরিকল্পনার পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার গতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে।