তীব্র গরম, বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে রাতের অতিরিক্ত চাহিদা, জ্বালানি সংকট এবং দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশজুড়ে আবারও ভয়াবহ আকার নিয়েছে লোডশেডিং।
কোথাও কোথাও দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
রাজধানীসহ শহর অঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে সংকট সবচেয়ে প্রকট। শিল্প-কারখানা, কৃষি, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়েছে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিদ্যুৎ এর দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। জামালপুরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়।
এছাড়া গত কয়েকদিনে নেত্রকোনা, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ, বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও এবং হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি বিদ্যুৎ বরাদ্দ চেয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)।
একই দাবি জানিয়ে গত সোমবার পৃথকভাবে চিঠি দিয়েছেন অন্তত চারজন সংসদ সদস্যও। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুন রাত ৮টায় দেশে মোট লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট।
এর মধ্যে ২ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট, অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ লোডশেডিং হয়েছে আরইবির আওতাধীন গ্রামীণ এলাকায়। আরইবির তথ্যমতে, তাদের গ্রাহকদের ১৭ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় গ্রাহকরা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না।
আরইবির চিঠিতে হামলা-ভাঙচুরের চিত্র: বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবকে পাঠানো আরইবির চিঠিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় লোকজন উপকেন্দ্রে হামলা, অফিস ঘেরাও, লাইনম্যানদের মারধর, ভাঙচুর, বিল আদায়ে বাধা এবং কর্মকর্তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার হুমকি দিচ্ছেন। ১০ জেলার ১৪টি স্থানে এমন ঘটনার তথ্য তুলে ধরে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আরইবি বলেছে, প্রচণ্ড গরম, বিশ্বকাপ ফুটবলের রাতের ম্যাচ এবং আগামীকাল ২ জুলাই শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে। চলমান সংকটে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংসদে মন্ত্রীর ব্যাখ্যা: গত সোমবার জাতীয় সংসদে বিধি-৩০০-এর আওতায় দেওয়া বিবৃতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কমে গেছে। একটি কেন্দ্রের বয়লার টিউব লিক করায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে উত্তাল সমুদ্রের কারণে কয়লা খালাস করা সম্ভব না হওয়ায় আরেকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও উৎপাদন কমে গেছে। তবে আগের চেয়ে পরিস্থিতি ভালো হয়েছে মন্তব্য করে মন্ত্রী জানান, উৎপাদন প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, চাহিদা ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ৩৩৯ মেগাওয়াট লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। কিছু এলাকায় লোডশেডিং থাকবে, তবে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।
সক্ষমতা ২৮ হাজার, উৎপাদন অর্ধেক: বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ থেকে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
কিন্তু জ্বালানি সংকট, বকেয়া বিল এবং তেল-কয়লার ঘাটতির কারণে অধিকাংশ সময় উৎপাদন সীমাবদ্ধ থাকছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে। শুধু সন্ধ্যার পিক আওয়ারে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালিয়ে উৎপাদন ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হচ্ছে।
বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ: গতকালও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। জামালপুরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়।
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ চলাকালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ জনতা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ঝালকাঠি, টাঙ্গাইল, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়ও মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, বর্তমানে ঢাকার তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তিনি বলেন, বকেয়া বিল পরিশোধ করে কয়লা, গ্যাস ও তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ বণ্টনে ভারসাম্য আনারও পরামর্শ দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহেও লোডশেডিং পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা কম। বিশেষ করে এইচএসসি পরীক্ষা ও চলমান দাবদাহের সময়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।