প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা। কয়েকদিন ধরে চলা এ আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, কণ্ঠভোটের মাধ্যমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল সংসদে সমাপনী আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রস্তাবিত বাজেটকে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ কর বছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হলেও প্রধানমন্ত্রী তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুরোধ জানান। একইভাবে ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ কর বছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ কর বছরের জন্য তা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেন।
এছাড়া জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য ও মৌজা মূল্যের জটিলতা দূর করতে বাজেটে যে বিশেষ বিধান আনা হয়েছিল, তা নিয়ে জনমনে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সংক্রান্ত বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ায় জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেই প্রস্তাবিত বিধানটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার জন্য অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বাজেটের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে সমালোচনা করেন। বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন বিরোধী দলের নেতা। তিনি বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, ওই পাচার অর্থের নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমাদের কোনো বাজেট ঘাটতি থাকবে না।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সম্পদের সঙ্গে অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে হবে। সম্পদ এল, আর অপরাধীরা থেকে গেল—তাহলে সঠিক শিক্ষা হবে না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে দ্রুততম সময়ে অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের ওপর অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের চাপ কমাতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘ট্যাক্স শুধু একটাই হবে, দ্বিতীয়টা আর তৃতীয়টা থাকবে না। তাহলে ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ট্যাক্স দিতে আগ্রহী হবে। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর জন্য বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে।
এর আগে রোববার আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির’ ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ‘অবাস্তব ও প্রচারণার দলিল’ বলে অভিহিত করেন।তিনি বলেন, এ বাজেটে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে ভোগ-বিলাস এবং আমদানিনির্ভর পরিকল্পনাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে আপনি সমাজে কনজাম্পশন ডিমান্ড (ভোগের চাহিদা) তৈরি করছেন, কিন্তু প্রোডাকশন বা ইনভেস্টমেন্ট ডিমান্ড সৃষ্টি করছেন না। মানুষ এই অর্থ দিয়ে ভারতীয় বা চীনা পণ্য কিনবে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং একটি নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী তৈরি হবে। আমাদের প্রয়োজন ছিল তরুণদের প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণের মাধ্যমে উৎপাদন খাতে সম্পৃক্ত করা।
দেশ থেকে অর্থ পাচারের প্রসঙ্গ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের টাকা লুটপাটকারী ও গণহত্যাকারীদের অপরাধকে আমি অভিন্ন মনে করি। এস আলম, বেক্সিমকো, ওরিয়ন বা নাসা গ্রুপের মতো যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য তাদের সম্পদ জাতীয়করণ এবং নতুন আইন প্রণয়ন করে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।
১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়। এবারের বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের ৫৫তম এবং বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ।
গতকাল তিনি বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন পরামর্শ ও সুপারিশের জন্য ধন্যবাদ জানান। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলছেন, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে আমরা কেবল একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য একটি সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করছি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করা পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা আলোচনায় বাজেটকে সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমুখী আখ্যা দিয়ে বলেন, এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তারা সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ বাজেটকে সহায়ক বলে মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্যরা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন। তারা কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের প্রশংসা করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে বাজেটে স্বপ্ন দেখলেও বছরজুড়ে জনগণকে স্বপ্নভঙ্গের খেসারত দিতে হয় বলে মন্তব্য করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।
তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সময় সরকার নানা স্বপ্ন দেখালেও বছরজুড়ে সেই স্বপ্নভঙ্গের পরিণতি জনগণকে ভোগ করতে হয়। রুমিন ফারহানা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, আর আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
তবে শুধু ঘোষিত ঘাটতিই নয়, প্রতি বছরই রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, বাস্তবে তা অর্জন করা সম্ভব হয় না। ফলে প্রকৃত ঘাটতি আরও বেড়ে যায় এবং দেশকে দেশি-বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হয়।