বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ক্ষেত্রেই করের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলছে। নতুন আয়কর কাঠামো অনুযায়ী করমুক্ত আয়ের সীমা ৩.৭৫ লাখ টাকা নির্ধারিত হলেও করহারের বিন্যাসে পরিবর্তন আসায় করদাতাদের ওপর আর্থিক চাপ লক্ষণীয়।
জানা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সঙ্গে কর ব্যবস্থার পরিবর্তন যুক্ত হয়ে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদরা ‘ব্র্যাকেট ক্রিপ’ নামে অভিহিত করেন। এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের বেতন বাড়লেও জীবনযাত্রার মানের কোনো উন্নতি হয় না, অথচ তাকে উচ্চ হারে কর দিতে হয়।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত মজুরি হ্রাস, ব্র্যাকেট ক্রিপ, পরোক্ষ কর এবং উচ্চ বাণিজ্য সুরক্ষার মতো বহুমুখী চাপের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ শ্রেণি। এই সব কটি কারণ একত্রে মিলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে কাগজে-কলমে আয় বাড়লেও পরিবারের সঞ্চয়ের ক্ষমতা নষ্ট করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মজুরি হারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশিরভাগ সময় জুড়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে ছিল। কার্যকর করের হার বাড়লেও মানুষের প্রকৃত মজুরি কমেছে। মাসে দেড় লাখ টাকা আয়ের সমপরিমাণ উপার্জনকারী একজন করদাতার কার্যকর করের বোঝা ২০১৬ সালের ৯ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু বাজেটে ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত করের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, সেখানে মূল্যস্ফীতির হারকে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক কম ধরা হয়েছে।
গত তিন বছরে গড় মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিল, সেখানে বাজেটের ধারণায় সর্বনিম্ন কর স্তরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ স্তরের জন্য মাত্র শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ ধরা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি যদি এভাবে উচ্চ স্তরেই থেকে যায়, তবে কর সীমার প্রকৃত মূল্য আরও কমতে থাকবে এবং সাধারণ মানুষ আরও বেশি উচ্চ করের ফাঁদে পড়বেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি, করের স্তরে সীমিত সমন্বয় এবং ভ্যাট-নির্ভর রাজস্ব মডেলের কারণে চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমছে।
তিনি আরও জানান, মানুষের মজুরি বাড়লেও খাদ্য, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত খরচ যেভাবে তীব্র গতিতে বেড়েছে, তাতে প্রকৃত আয় আসলে থমকে গেছে বা কমে গেছে। করের সীমা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি অনেক কর্মীকে উচ্চ করের আওতায় নিয়ে যাচ্ছে। অথচ, তাদের জীবনযাত্রার মানের কোনো বাস্তব উন্নতি হচ্ছে না।
তবে সরকারের কর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো- সমাজে আয়-বৈষম্য কমানো, ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর নিয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই নীতির উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। প্রত্যক্ষ করের বাইরে পরোক্ষ করের বিস্তৃত জালে আটকা পড়ে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি করের বোঝা বহন করছেন। অথচ উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য কর ফাঁকি বা কর পরিকল্পনার নানা সুযোগ থাকলেও সাধারণ মানুষের সেই সুযোগ নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের কর কাঠামো সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ এতে আয়ের তুলনায় দরিদ্র মানুষকে বেশি কর দিতে হয়। যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয় এবং সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বাজেটে বেড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের করের চাপ। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলেছে, নতুন কর কাঠামোয় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। রাজস্ব আদায়ে আইএমএফের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় যোগ হচ্ছে বাড়তি করের বোঝা। হঠাৎ ভ্যাট, সম্পূরক শুল্কসহ বিভিন্ন ধরনের কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের গড় আমদানি শুল্ক ও করপোরেট করহার-দুটোই বেশি। এর সঙ্গে নীতি ধারাবাহিকতার অভাব, ব্যবসার লাইসেন্স-পারমিট গ্রহণে জটিলতা, বন্দর-কাস্টমস-আয়করসহ সরকারি অফিসের ঘুস-দুর্নীতি বিনিয়োগকারীদের গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো যন্ত্রণা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমলাতান্ত্রিক এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশি বিনিয়োগকারীরা কোনোরকমে নিশ্বাস নিচ্ছেন, হাঁপ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন আর অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থা ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘যাদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, তাদের করের বোঝা সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অথচ যাদের বার্ষিক আয় ৩০ লাখ টাকার বেশি, তাদের কর বৃদ্ধি হবে মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।’
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্যমতে, বাংলাদেশের গড় শুল্কহার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। রপ্তানি খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের গড় শুল্কহার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ আর কম্বোডিয়ার ১০, লাওসের ৮ দশমিক ৭, পাকিস্তানের ১০ দশমিক ৩ এবং শ্রীলংকার ৮ দশমিক ৪ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতের গড় শুল্কহার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি, ১৭ শতাংশ। এর প্রধান কারণ-ভারত অভ্যন্তরীণ কৃষি ও কিছু নির্দিষ্ট উৎপাদনশীল খাতকে উচ্চ শুল্ক সুরক্ষা দেয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের নন-লিস্টেড কোম্পানির করহারও অনেক বেশি। বাংলাদেশের করপোরেট করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ; যেখানে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওসের ২০, আর ভারতের ২৫ শতাংশ।
বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যবসার প্রধান প্রতিবন্ধকতা উচ্চ করহার ও জটিল কর-কাঠামো। প্রশাসনিক জটিলতাও অনেক আছে যেমন- আগাম কর, অগ্রিম আয়কর, উৎসে কর, উৎসে মূসকসহ নানা নামে নানা বিধিনিষেধ পরিপালন করতে হয়। যার কারণে কার্যকর করহার ৪৫-৪৮ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। এতে বেশি কর দিয়ে দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীই ব্যবসা করতে পারবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, দেশে বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজেটে অনেক উদ্যোগ যেমন আছে, তেমনই কিছু বিষয় এড়িয়ে গেছে।
যেমন: করপোরেট করহার ৫ বছরের জন্য অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় এবং এত বেশি উচ্চহার বিনিয়োগবান্ধব নয়।
তিনি আরও বলেন, আয়কর আইনে নানা শর্ত পরিপালনে বাধ্যবাধকতা আছে, যা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিপালন সম্ভব নয়। এ কারণে বাংলাদেশে কার্যকরী করহার প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। করপোরেট করহারেও বৈষম্য আছে।
একই প্রকৃতির ব্যবসা করেও দেশি কোম্পানির চেয়ে বিদেশি কোম্পানির করহার অনেক বেশি। এ ধরনের বৈষম্য থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, বাজেট পাসের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর পরিপত্রের মাধ্যমে কিছু কিছু বিধান ভবিষ্যৎমুখী হিসেবে সংশোধন করে থাকে। তবে করব্যবস্থার স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য এই সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার।