বেইজিং সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরতেই এখন কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন—পরবর্তী গন্তব্য কি দিল্লি? চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পর এবার ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের দিকেই নজর দিচ্ছে ঢাকা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বেইজিং ও দিল্লির মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সে প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নয়, বরং ঢাকা যে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের পথে হাঁটছে, সে বার্তাও দেবে।
চার দিনের সরকারি সফর শেষে শুক্রবার দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি ছিল তার প্রথম চীন সফর। আর সেই সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক, একাধিক সহযোগিতা চুক্তি এবং বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব প্রদর্শন—সব মিলিয়ে সফরটি দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর ও কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। তিনি উল্লেখ করেন, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সর্বমোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বেইজিং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করতে ঐকমত্য পোষণ করেছে।
মাহদী আমিন জোর দিয়ে বলেন, চীন বাংলাদেশের একটি কৌশলগত অংশীদার হতে চায়। চীন বিশ্বাস করে, গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ নিয়ে যা বলেছেন চীনের রাষ্ট্রপতি: বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকার নতুন সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন। শি জিনপিং বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেমনই হোক, চীনের বন্ধুত্বের নীতি পরিবর্তন হবে না এবং চীন সবসময় বাংলাদেশের একটি বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে থাকবে। বৈঠকে তিনি ঢাকার সঙ্গে উচ্চমানের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ বাস্তবায়নে চীনের আগ্রহের কথা জানান। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় পূর্ণ সমর্থন এবং যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করার পক্ষে বেইজিংয়ের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
১৭টি সমঝোতা ও চুক্তি স্বাক্ষরিত: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে গভীর সহযোগিতা বাড়াতে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধান সমঝোতা ও চুক্তির খাতগুলো হলো—
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা: দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার চুক্তি।
বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল: চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কারখানা স্থাপনের জন্য সহযোগিতা।
বন্দর আধুনিকীকরণ: মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের জন্য বাণিজ্যিক চুক্তি।
মিডিয়া ও তথ্য আদান-প্রদান: সংবাদ সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মধ্যে খবর আদান-প্রদান, যৌথ গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা।
পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা: নদী খনন, বন্যা ঝুঁকি হ্রাস এবং তিস্তা অববাহিকা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহায়তাসহ পানি সম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা।
সংস্কৃতি ও শিক্ষা: দুই দেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনিময় এবং বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা: স্বাস্থ্য খাতে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং কার্ডিয়াক সার্জারি ও রোবট ফিজিওথেরাপি বিষয়ে সহযোগিতা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগে নতুন গতি আনছে। বেইজিং সফর সেই কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এবার নজর দিল্লি সফরে: বেইজিং সফর শেষ হতেই কূটনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি এখন সম্ভাব্য দিল্লি সফরের দিকে। নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আগামী মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যেতে পারেন। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
যদি এই সফর অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও আরও কার্যকর পর্যায়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দিল্লি সফরে যে ইস্যু গুরুত্ব পেতে পারে: কূটনৈতিক সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির অগ্রগতি, সীমান্ত হত্যা সম্পূর্ণ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ, সীমান্তে পুশ-ইন ও অনিয়মিত অনুপ্রবেশের বিষয়, বাণিজ্য বৈষম্য কমানো এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ (কানেক্টিভিটি) ও ট্রানজিট, নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরে রাজনৈতিক সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর পাশাপাশি অর্থনীতি ও বাণিজ্য সহযোগিতাও সমান গুরুত্ব পাবে।
ঢাকার ভারসাম্যের কূটনীতি: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন ও ভারতের গুরুত্ব সমানভাবে বিবেচিত হয়। একদিকে চীন বাংলাদেশের বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার, অন্যদিকে ভারত নিকটতম প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার। ফলে বেইজিং সফরের পর দিল্লি সফর হলে সেটি বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেই দেখা হবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকার কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে উভয় দেশের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক ও পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর সম্পর্ক জোরদার করার কৌশল নিয়েছে। বেইজিং সফরে সেই বার্তা যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি সম্ভাব্য দিল্লি সফর সেই কৌশলকে আরও সুসংহত করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বেইজিং সফর যদি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার সূচনা করে থাকে, তবে সম্ভাব্য দিল্লি সফর হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পরবর্তী বড় পদক্ষেপ।