বড় বাজেট বড় ঘাটতি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে সংশয়

আজহারুল হক ফরাজী

বাণিজ্য

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য

2026-06-23T13:10:26+00:00
2026-06-23T13:10:26+00:00
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
বাণিজ্য
সন্তুষ্ট নন ব্যবসায়ীরা
বড় বাজেট বড় ঘাটতি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে সংশয়
আজহারুল হক ফরাজী
মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ১:১০ পিএম 
বড় বাজেট বড় ঘাটতি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে সংশয়
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। 

তবে অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং ব্যবসায়ী নেতাদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন, ঘাটতি অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের ওপর সম্ভাব্য চাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। 

এই ঘাটতি পূরণে সরকার দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে চায়, কিন্তু রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হলে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে মোট আদায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি থাকতে পারে। সেই অবস্থান থেকে আগামী অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ৫০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে, যা সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাকের মতে, নতুন অর্থবছরে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অন্তত এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, সরকার একদিকে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে কর ছাড় ও প্রণোদনার মেয়াদ বাড়িয়েছে। ফলে রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তার মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে, যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। রাজস্ব বাড়াতে করের হার বৃদ্ধির পরিবর্তে করজাল সম্প্রসারণ ও কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও বাজেটের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক সরকারের বড় স্বপ্ন থাকা স্বাভাবিক হলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন সহজ হবে না। 

তিনি বলেন, সরকার ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করতে চাইলেও মূল প্রশ্ন হচ্ছে সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হলে সরকারকে হয় অতিরিক্ত ঋণ নিতে হবে, নয়তো ব্যয় কমাতে হবে। আর অর্থ ছাপিয়ে ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।

আহসান এইচ মনসুরের মতে, অর্থনীতিতে সরকারের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতের অবদান ৮৬ শতাংশ। ফলে সরকার যদি আর্থিক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়ন সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

এনবিআরের আশাবাদ, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন : যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন লক্ষ্য অর্জন নিয়ে আশাবাদী। 

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, ভ্যাট ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, কিউআর কোডের মাধ্যমে সিগারেট খাতে রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব। তার দাবি, শুধু ভ্যাট ব্যবস্থার অটোমেশন থেকেই অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সিগারেট খাতে ফাঁকি রোধের মাধ্যমে আরও সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। তবে এনবিআরের এই আশাবাদে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না ব্যবসায়ী নেতারা।

ব্যবসায়ীদের শঙ্কা: চাপ বাড়বে পুরোনো করদাতাদের ওপর : মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে। এই বাস্তবতায় বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া নতুন লক্ষ্য অর্জন কঠিন।

ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান-উর-রহমানের আশঙ্কা, রাজস্ব লক্ষ্য পূরণের চাপ শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই গিয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার আশঙ্কা দেখা দিলে মাঠপর্যায়ে কর প্রশাসন অনেক সময় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে, যা ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, নতুন করদাতা যুক্ত করার পরিবর্তে যদি পুরোনো করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো হয়, তাহলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক গতি ছাড়া লক্ষ্য অর্জন কঠিন : অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল কর প্রশাসনের সংস্কার দিয়ে রাজস্বের বিশাল লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাবে না। 

বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি যুক্ত হলে বাজেট বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করতে হলে শুধু অটোমেশন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট হবে না। করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। অন্যথায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই উচ্চাভিলাষী বাজেট কাগজে-কলমে বড় থাকলেও বাস্তবায়নের পথে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। আর সে ক্ষেত্রে বাড়তে পারে বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা এবং বেসরকারি খাতের ওপর চাপ।



Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: