৪২ বছরে একটিও পেটেন্ট জোটেনি বিএফআরআই ও বিএলআরআইয়ের

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে চার দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা

2026-06-22T12:30:50+00:00
2026-06-22T12:36:52+00:00
  সোমবার, ২২ জুন ২০২৬,
৮ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
জাতীয়
১৯৮৪ সালের পর থেকে নিরন্তর গবেষণা
৪২ বছরে একটিও পেটেন্ট জোটেনি বিএফআরআই ও বিএলআরআইয়ের
সুমন হাওলাদার
সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ১২:৩০ পিএম  আপডেট: ২২.০৬.২০২৬ ১২:৩৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে চার দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধিতে এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণার অবদান থাকলেও ৪২ বছরেও তাদের ঝুলিতে যোগ হয়নি একটি পেটেন্ট (কোনো নতুন উদ্ভাবনের জন্য সরকার কর্তৃক উদ্ভাবককে দেওয়া একটি একচেটিয়া আইনি অধিকার বা মেধাস্বত্ব)। 

জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) দেশের মৎস্যখাতে বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জন করেছে। 

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত শতাধিক গবেষণা প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা প্যাকেজ উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণ করা হয়েছে। দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সংরক্ষণ এবং চাষযোগ্য মাছের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

বিএফআরআই এ পর্যন্ত হারিয়ে যাওয়া প্রায় ৩৫টি দেশীয় প্রজাতির মাছ (যেমন- পাবদা, গুলশা, টেংরা, মহাশোল, চিতল, ফলি ইত্যাদি) কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। মাছের দ্রুতবর্ধনশীল জাত (যেমন- থাই পাঙ্গাশ, গিফট তেলাপিয়া) এবং দেশীয় মাছের চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবনের ফলে দেশে মাছের প্রাপ্যতা বহুগুণ বেড়েছে। লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চলে নোনা টেংরা, পারশে, কাঁকড়া এবং সীউইড চাষে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে। 

ইলিশ নিয়ে তাদের বিস্তর গবেষণা থাকলেও পেটেন্ট পাওয়ার মতো কোনো অবদান না। সম্প্রতি সরকারি এ প্রতিষ্ঠান দেশের মিঠা পানির মাছের বিভিন্ন রোগব্যাধি নিরাময় ও গবেষণায় মড়ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনসহ নানা কার্যকর প্রযুক্তি তৈরিতে প্রকল্প নিয়েছে। 

অপরদিকে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গবাদিপশু ও পোল্ট্রির উন্নয়নে ৬০টিরও বেশি প্রযুক্তি ও ১৯টি প্যাকেজ উদ্ভাবন করেছে। মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ও পাবনা গরুর মতো দেশীয় জাতের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। 

এর মধ্যে রয়েছে ডিম উৎপাদন বাড়াতে ‘বিএলআরআই লেয়ার মুরগি-১’ ও ‘বিএলআরআই সোনালী মুরগি’ উদ্ভাবন। খড় প্রক্রিয়াজাতকরণ (ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র বা ইউএমএস), সাইলেজ তৈরি এবং সজনে পাতা ও সবজির বর্জ্য থেকে উন্নত গোখাদ্য প্রস্তুতকরণ। 

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অল্প সময়ে দেশি গরুর দৈহিক ওজন বাড়ানোর জন্য লাভজনক ‘ক্যাটল ফ্যাটেনিং’ মডেল উদ্ভাবন। পশুপাখির বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তাররোধে সময়োপযোগী টিকা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন। অধিক দুধ ও মাংস উৎপাদনশীল মহিষের জাত উন্নয়ন এবং মহিষের কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে অবদান। 

সম্প্রতি মাংসের দাম কমাতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নেপিয়ার জাতের অধিক মাংস উৎপাদন উপযোগী ঘাস উৎপাদনে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, খাদ্য ফর্মুলা, প্রজননকৌশল এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হলেও সেগুলোর পেটেন্ট নিবন্ধনের উদ্যোগ খুবই সীমিত ছিল। ফলে গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে ব্যবহৃত হলেও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান দুটি পিছিয়ে রয়েছে। 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে গবেষণা ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিএলআরআইয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, বৈদেশিক সহায়তা এবং বিশেষ গবেষণা কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত অর্থায়ন করা হয়। 

গবেষণাগার আধুনিকীকরণ, যন্ত্রপাতি ক্রয়, বিজ্ঞানী নিয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ। ফলে পেটেন্ট নিবন্ধনের বিষয়টি দীর্ঘ সময় গুরুত্ব পায়নি। অধিকাংশ গবেষণা ফলাফল প্রকাশনা, প্রশিক্ষণ এবং সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষক ও খামারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। 

তবে গবেষণা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক গবেষণা ব্যবস্থায় শুধু প্রযুক্তি উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়। উদ্ভাবনের মেধাস্বত্ব সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পেটেন্ট থাকলে প্রযুক্তির স্বত্ব নিশ্চিত হয় এবং গবেষণার বাণিজ্যিক মূল্য বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও স্বীকৃতি পায়। 

তাদের মতে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পেটেন্ট ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উদ্ভাবনের বাণিজ্যিকীকরণে আলাদা ইউনিট গড়ে তোলা প্রয়োজন। গবেষকদের পেটেন্ট আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং আইনি সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। একইভাবে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই অর্জনের পেছনে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান রয়েছে। তবে উদ্ভাবনকে পেটেন্টে রূপান্তর করতে না পারা একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষণাখাতে সরকারি বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। 

নতুন গবেষণা অবকাঠামো, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং দক্ষজনবল তৈরিতে কাজ চলছে। এ অবস্থায় গবেষণার ফলাফলকে আন্তর্জাতিক মানের মেধাস্বত্ব সুরক্ষার আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএফআরআই ও বিএলআরআইয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে অনেকগুলো পেটেন্টযোগ্য হতে পারে। সঠিক মূল্যায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে এই দুই প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট অর্জনে সফল হতে পারে। 

এতে গবেষণার মানোন্নয়ন, প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখা সম্ভব হবে। ৪২ বছরের গবেষণা কার্যক্রমে উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং খামারি পর্যায়ে জ্ঞান বিস্তারে সাফল্য থাকলেও পেটেন্ট অর্জনের শূন্যতা এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। 

গবেষণাকে বৈশ্বিক মানদন্ডে নিয়ে যেতে হলে উদ্ভাবনের স্বীকৃতি ও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার বিষয়টি আগামী দিনে আরও বেশি গুরুত্ব পাবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, দেশকে এগিয়ে নিতে বিজ্ঞানীদের সত্যিকার অর্থে মৌলিক গবেষণায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। 

গবেষকদের প্রমাণ করতে হবে যে তাদের গবেষণা বিদ্যমান বৈশ্বিক গবেষণা থেকে স্বতন্ত্র, নতুনত্বপূর্ণ এবং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম। দেশের মৎস্য প্রাণিসম্পদ খাতে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এ খাতের উন্নয়নে গবেষণা ও উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। 
গবেষণার মাধ্যমে যারা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন, সরকার তাদের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশেষভাবে সম্মানিত করবে। সরকার গুণীজন, বিজ্ঞানী ও গবেষকদের যথাযথ মর্যাদা দিতে চায় এবং নতুন নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিকাশে তাদের ভূমিকার দিকে প্রত্যাশার দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। 

বাংলাদেশে বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকলেও এখনো গবেষণার একটি সুস্পষ্ট ও স্বতন্ত্র ধারা গড়ে ওঠেনি। দেশে যখন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তখন তার দৃশ্যমান ফলাফল ও নিজস্ব গবেষণা-ধারা প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের মৌলিক গবেষণা থাকতে হবে। অর্থাৎ গবেষণার পেটেন্ট থাকতে হবে। অনেকের ভুল ধারনা, পেটেন্ট অনুমোদন হয় না। একটি নির্দিষ্ট ফরমেটে এগুলো দাখিল করতে হয়। পেটেন্ট দাখিলের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের ১৯১ টি দেশ এসব দেখতে পারে। 

গবেষণার কতটা অংশ নকল করা হয়েছে, সেটা জানা যায়। তবে ৪০ শতাংশের বেশি নকল বা কপি হলে সেটি কখনো হবে না। ৭১ থেকে ৯৮ সাল পর্যন্ত পেটেন্ট হয়েছে মাত্র ২টি। ভারত মিলিয়নের বেশি পেটেন্ট পেয়েছে। আমাদের কোনো মৗলিক গবেষণা হয় না। বিএলআরআইয়ের ৪১ বছরের গবেষণায় একটিও পেটেন্ট নাই। বিএফআইআয়েরও একই অবস্থা। বলা যায়, তাদের কোনো মৌলিক গবেষণা নাই।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: