দেশে প্রথমবারের মতো একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (এফটিজেড) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিইএ)।
বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বন্দরের গতি আনতে দুটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে একটি কক্সবাজারের মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরের কাছে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী এলাকায়। এ উদ্যোগ দেশে প্রথম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে। পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, আধুনিক লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বেজার গভর্নিং বোর্ডের নবম সভায় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এফটিজেড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা সংস্কারের কাজ চলছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ আইন-২০১০, কাস্টমস আইন-২০২৩, ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০২৪, আমদানি ও রপ্তানি নীতিসহ সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হচ্ছে।
জানা যায়, গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রেখেছে বর্তমান সরকারও। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট প্রস্তাবে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনে কাস্টমস আইনে একটি নতুন অধ্যায়সহ কিছু বিধান যোগ করার প্রস্তাব করেছেন। এই সিদ্ধান্ত বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে বলেও মনে করছে সরকার।
এরই মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দেশের দুটি স্থানে প্রায় ৬০০ একর জমিতে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হবে। যেখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কাস্টমস ও করসংক্রান্ত অনেক বিধিনিষেধ শিথিল থাকে। এতে বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সহজে বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবেন।
বেজা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি ও গবেষণা কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফ্রি ট্রেড জোন পরিচালনাব্যবস্থা, আইন, নীতিমালা ও প্রণোদনা কাঠামো বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত সুপারিশমালা প্রস্তুত করেছে।
সেই সুপারিশের ভিত্তিতে অবকাঠামোগত সুবিধা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য সংযোগ, লজিস্টিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনায় কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী আনোয়ারাকে দেশের প্রথম মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য ১৪ ধরনের পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যে প্রথমটিই হলো বাণিজ্য প্রসার ও বিনিয়োগ আকর্ষণের মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। বিষয়টিকে খুবই ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন দেশের শিল্পমালিক ও রপ্তানিকারকরা।
তারা বলছেন, এই উদ্যোগ খুবই প্রয়োজনীয় এবং প্রশংসনীয়। যেসব দেশ বাণিজ্যকে গুরুত্ব দেয়, তাদের প্রায় সবারই এ ধরনের অঞ্চল রয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দ্রুত এবং আমদানি করতে হবে এমন কাঁচামাল হাতের কাছে পাওয়া যায়।
এছাড়া ছোট ছোট কারখানার মালিক, যাদের বড় লটের কাঁচামাল আমদানির সক্ষমতা নেই, তারা এখান থেকে প্রয়োজনমতো কাঁচামাল কিনতে পারে। এতে আমদানি খরচ অনেক কমে যায়। কারণ অনেক কাঁচামাল রয়েছে যেগুলো অল্প পরিমাণ আনলে যা খরচ, বেশি পরিমাণে আনলেও প্রায় একই খরচ।
এছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে সুবিধা হলে আশপাশের দেশগুলোর ক্রেতারা দূর থেকে পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি না করে আমাদের দেশ থেকে নেবে। এতে তাদের খরচ কম হবে এবং আমাদেরও মুনাফা হবে। সরকারও এই অঞ্চল থেকে বড় ধরনের রাজস্ব আয় করতে পারবে।
দেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, এই উদ্যোগটি আরও আগেই নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। প্রতিটি দেশেই এমন অঞ্চল রয়েছে। আমি নিজে দুবাইয়ের একটি জোনে ওয়্যারহাউস ভাড়া নিয়ে পণ্য রপ্তানি করি। সেখানে নিয়ে পণ্য রাখি, সেখান থেকে আশপাশের দেশের বায়াররা পণ্য নিয়ে যান। কারণ তারা বড় লট নিতে পারেন না, ছোট ছোট লটে পণ্য নেন। আর আমার ছোট লট দিয়ে পোষায় না।
তিনি বলেন, এই অঞ্চল স্থাপন হলে সরকার এখান থেকে ভাড়া পাবে, তার অবকাঠামো ব্যবহারে ফি পাবে। কিছু লোকের কাজের ব্যবস্থা হবে। তার চেয়ে বড় সুবিধা হলো আমদানি-রপ্তানি ব্যাপক বাড়বে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রণোদনা এবং অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই অঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। এফটিজেডের মধ্যে পরিচালিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজারে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতার সক্ষম হয়, যার ফলে দেশের রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া এর ফলে পণ্য সরবরাহ চেইন সমৃদ্ধ হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের প্রথম মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল শুধু বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণেই নয়, বরং বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথও সুগম করবে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে দেশের সংযোগ আরও জোরদার হবে এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) ফেলো সদস্য ও কর পরামর্শক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এবার বাজেটে অনেক ভালো উদ্যোগ রয়েছে, এর অন্যতম হলো মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত। এর যথাযথ বাস্তবায়ন যদি করা যায়, তবে দেশের বাণিজ্য প্রসারে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
এতে একদিকে যেমন এসএমই ও এমএসএমই খাতসহ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেইন লিড টাইম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ওপর চাপ কমবে। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।