দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক কৌশল দৃশ্যমান হচ্ছে। বড় জনসমাবেশ বা দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিবর্তে এখন বিভিন্ন এলাকায় কয়েক মিনিটের ঝটিকা মিছিল, স্লোগান, ভিডিও ধারণ এবং দ্রুত স্থান ত্যাগের প্রবণতা বাড়ছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, যশোর, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নামে এ ধরনের কর্মসূচির খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিটি ঘটনার পরই জড়িতদের শনাক্তে মাঠে নেমেছে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাল্টা অভিযানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় কর্মসূচি আয়োজনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বিকল্প কৌশল হিসেবে ঝটিকা মিছিলকে বেছে নিচ্ছে। কয়েক মিনিটের জন্য রাজপথে অবস্থান, স্লোগান, ব্যানার প্রদর্শন, ভিডিও ধারণ এবং দ্রুত এলাকা ত্যাগ, এই পদ্ধতিই এখন তাদের প্রধান কৌশল হিসেবে দেখা যাচ্ছে। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার কারণে এসব কর্মসূচির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে গাজীপুরে। ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। ভিডিওতে পুলিশের উদ্দেশে হুমকিসূচক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে ভিডিও বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য এবং স্থানীয় সূত্রের সহায়তায় জড়িতদের শনাক্তের কাজ শুরু হয়।
রাজধানীতেও একই ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে। গতকাল রোববার সকালে মোহাম্মদপুরের কলেজগেট এলাকায় ঝটিকা মিছিল করার সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ১০ নেতাকর্মীকে আটক করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানা জানান, পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের আটক করে এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
চট্টগ্রামেও গত কয়েক দিনে নগরীর জিইসি মোড়, দুই নম্বর গেট ও পলোগ্রাউন্ড এলাকায় পৃথক সময়ে একাধিক ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মিনিটের মধ্যে কর্মসূচি শেষ করে অংশগ্রহণকারীরা দ্রুত সরে যান। পরে ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রমে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে সিলেটে। নগরের নবাব রোড ও শেখঘাট এলাকায় ঝটিকা কর্মসূচির পর ভিডিও বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে আটক করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, প্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
যশোর, কুমিল্লা, দাউদকান্দি, নোয়াখালী, শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহেও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঝটিকা মিছিলের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভোর বা কম জনসমাগমের সময় কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অংশগ্রহণকারীরা স্থান ত্যাগ করছেন। পরে সেই ভিডিও ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব ভিডিওই পরবর্তীতে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এখন শুধু ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা নয়, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভিডিও, স্থিরচিত্র, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং গোয়েন্দা প্রতিবেদন মিলিয়ে অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচির ধরনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রধান মাধ্যম ছিল বড় সমাবেশ ও দীর্ঘ মিছিল। এখন ডিজিটাল যুগে কয়েক মিনিটের কর্মসূচিও মুহূর্তের মধ্যে সারা দেশে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে। ফলে স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ প্রচার পাওয়ার কৌশল হিসেবেই ঝটিকা কর্মসূচির ব্যবহার বাড়ছে।
তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, এই প্রবণতা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। আকস্মিক মিছিল, পাল্টা ধাওয়া কিংবা তাৎক্ষণিক অভিযানের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রশাসনের সংযত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদরদপ্তরের এক উধ্বতন কর্মকর্তা ( নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভোরের ডাককে বলেন, কোনো সংগঠন আইন অমান্য করে কর্মসূচি পালন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজধানী, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তি আটক হয়েছেন। আরও অনেককে শনাক্তের কাজ চলছে। পুলিশের ভাষ্য, আইন সবার জন্য সমান এবং আইন ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি ও কর্মীদের সক্রিয়তা প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও নিয়েও সতর্ক করছে প্রশাসন। কর্মকর্তাদের দাবি, অনেক সময় পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয় অথবা সম্পাদিত ভিডিও দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে ২৩ জুনকে সামনে রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান জানিয়েছেন, ওই দিনকে কেন্দ্র করে কেউ যদি সহিংসতা, নাশকতা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বা যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করতে সব ইউনিটকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজপথের কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও রাজনৈতিক লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও যেমন একটি পক্ষের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হচ্ছে, তেমনি সেটিই আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের প্রধান প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফলে রাজপথ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, দুই জায়গাতেই সমানভাবে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে।
সার্বিকভাবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক উত্তাপ এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
একদিকে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও ধারাবাহিক পুলিশি অভিযান, এই দুই প্রবণতাই এখন সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে।
আগামী দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর। আপাতত দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, ‘ঝটিকা মিছিল বনাম তাৎক্ষণিক অভিযান’।