নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এক ব্যক্তিকে অপহরণের চেষ্টার সময় স্থানীয় জনতার গণপিটুনির শিকার হওয়া ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তিন সদস্যসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে ভুক্তভোগী অমিত হাসান মিরাজ বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ঢাকা দক্ষিণ ডিবির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মামুন মাতুব্বর, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমান উল্লাহ, কনস্টেবল কবির আহমেদ, কনস্টেবল আকাশ আহমেদ, গাড়িচালক আবু বকর সিদ্দিক ও মো. সেলিম মিয়াকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা দক্ষিণ ডিবির টিম ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শফিকুল ইসলাম সুমন জানান, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে এসআই মামুন মাতুব্বর, এএসআই আমান উল্লাহ, কনস্টেবল কবির আহমেদ ও কনস্টেবল আকাশ আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, তারা সাদাপোশাকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার এলাকায় গিয়ে স্থানীয়দের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ জুন দুপুরে অমিত হাসান মিরাজ সোনারগাঁয়ের বারদী স্ট্যান্ড থেকে এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে রূপগঞ্জের গাউছিয়া সিএনজি স্ট্যান্ডে যান। সেখানে স্ট্যান্ডসংলগ্ন একটি পাবলিক টয়লেটের সামনে অবস্থানকালে এসআই মামুন মাতুব্বর, এএসআই আমান উল্লাহ ও কনস্টেবল কবির আহমেদ নিজেদের সিআইডি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে তাকে জোরপূর্বক টয়লেটের ভেতরে নিয়ে যান। তল্লাশি চালিয়ে কিছু না পেয়ে তারা তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
এসময় মিরাজ চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তিনজনকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। অপরদিকে কনস্টেবল আকাশ আহমেদ, চালক আবু বকর সিদ্দিক ও মো. সেলিম মিয়া ঘটনাস্থল থেকে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ জুন আড়াইহাজারের জয়নাল নামে এক ব্যক্তি এবং প্রায় এক মাস আগে সোনারগাঁয়ের জাকির হোসেনকে একই কৌশলে অপহরণ করে ঢাকার কেরানীগঞ্জে আটকে রাখা হয়। পরে তাদের পরিবারের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
এ বিষয়ে অবগত থাকার কারণে মিরাজ ঘটনাটি জয়নালের পরিবারকে জানালে তারা অভিযুক্তদের আড়াইহাজারের শান্তিরবাজার এলাকায় নিয়ে যেতে বলেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় অভিযুক্তদের সেখানে নেওয়া হলে জয়নাল ও তার স্বজনরা তাদের শনাক্ত করেন। এরপর তাদের আড়াইহাজার থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে এএসআই আমান উল্লাহকে বলতে শোনা যায়, জয়নালের পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা আড়াই লাখ টাকা এবং জাকির হোসেনের পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের একটি অংশ তিনি পেয়েছেন। ভিডিওতে তিনি আরও দাবি করেন, ওই অর্থের মধ্যে ৭০ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা করে ঢাকা দক্ষিণ ডিবির টিম ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শফিকুল ইসলাম সুমনকে দেওয়া হয়েছে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে ইন্সপেক্টর শফিকুল ইসলাম সুমন বলেন, আমি কোনো অর্থ গ্রহণ করিনি। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় সংশ্লিষ্ট চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হওয়া ঢাকা দক্ষিণ ডিবির চার সদস্যসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। গুটি কয়েক সদস্যের অপকর্মের দায় পুরো পুলিশ বাহিনী বহন করবে না। বিষয়টি ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিভাগীয় ব্যবস্থাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন বৃহস্পতিবার রাতে গণপিটুনিতে আহত ঢাকা দক্ষিণ ডিবির এসআই মামুন মাতুব্বর, এএসআই আমান উল্লাহ ও কনস্টেবল কবির আহমেদকে উদ্ধার করে আড়াইহাজার থানা পুলিশ। পরে তাদের আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়। আহতদের মধ্যে এসআই মামুন মাতুব্বরের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।