ভারত থেকে বাংলাদেশের অবৈধভাবে নাগরিকদের ঠেলে দেওয়া বা ‘পুশ-ইন’ ইস্যুতে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ল তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছেন, এটা আন্তর্জাতিক আইনেরও গুরুতর লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাইলে অবিলম্বে ভারতের পুশইন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক লগুলো সীমান্ত সংকটকে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। তারা সরকারকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর আহ্বান জানিয়েছে।
এ ছাড়া পুশইনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানধাবিকার সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, একদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এসব মানুষকে জোর করে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাশে (বিজিবি) তাদের ঠেকিয়ে দিচ্ছে। ফলে দুই দেশের ‘শূন্যরেখায়’ চরম দুর্ভোগে আটকে আছে বেশ কিছু পরিবার।
পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর “শনাক্ত, বাদ এবং বহিষ্কার” নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বেশ কয়েক হাজার সন্দেহভাজন অবৈধ বাংলাদেশিকে পুশইন করার দাবি করা হচ্ছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তারা এ ধরনের অসংখ্য পুশইনের চেষ্টা ইতিমধ্যে প্রতিহত করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে প্রায় ৪,৮০০ থেকে ৫,০০০ মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিএসএফের পক্ষ থেকে পুশইনের চেষ্টা চালানো হলেও বিজিবি ও স্থানীয়রা যৌথভাবে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করেছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাশে (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর মধ্যে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পুশইন বন্ধের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া জাতিসংঘ এই সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
ভারত থেকে বাংলাভাষীর, বিশেষ করে মুসলমানদের কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানধাবিকার সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, একাধিক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এসব মানুষকে জোর করে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাশে (বিজিবি) তাদের ঠেকিয়ে দিচ্ছে। ফলে দুই দেশের ‘শূন্যরেখায়’ চরম দুর্ভোগে আটকে আছে বেশ কিছু পরিবার।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠুরভাবে পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রাখছে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম মানবাধিকারের ধার ধারা হচ্ছে না। তিনি ভারত সরকারের প্রতি এই বেআইনি বহিষ্কার বন্ধ এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান। পাশাপাশি মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের অবসানের দাবি জানান তিনি।
এদিকে সীমান্তে হত্যা এবং বাংলাদেশে ভারতীয়দের ঠেলে পাঠানোর (পুশইন) প্রতিবাধে সম্প্রতি রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। কর্মসূচি থেকে জোটের নেতারা ভারত, দেশটির সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির কড়া সমালোচনা করেন। ভারতকে যথায জবাব না দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারেরও পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেও সমালোচনা করেন তাঁরা।
বাংলাশে-ভারত সীমান্তের পশ্চিমাংশের বিভিন্ন পয়েন্টে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ‘পুশ ইন’ তৎপরতায় সীমান্তে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি ভোরের ডাককে বলেন, বিএসএফ শিশু-নারীসহ কয়েকশ মানুষকে বলপ্রয়োগ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দিয়ে চরম অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই মানুষরে একটা অংশকে তারা সীমান্তের শূন্য রেখায় ঠেলে দিয়েছে। সাইফুল হক বলেন, উভয়দেশ অবস্থানরত বৈধ নাগরিকদের তাদের স্বস্ব দেশে ফেরত পাঠাবার বৈধ প্রক্রিয়া রয়েছে। আইনগত এই প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে জবরদস্তি করে পুশ ইন করা কোনভাবেই নেবে নেওয়া যাবে না। এটা আন্তর্জাতিক আইনেরও গুরুতর লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাইলে অবিলম্বে ভারতের পুশইন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে।
এদিকে রাষ্ট্রের অভিবাসী নাগরিকরে নির্যাতন করে পাশের দেশে পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল বলে মন্তব্য করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি বলেন, পুশইনের মাধ্যমে ভারত সরকার কূটনৈতিক সৌজন্য, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার অভিবাসী নাগরিককে অন্য দেশের মানুষ বলে জোরপূর্বক সীমান্তের শূন্যরেখায় কয়েকদিন খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে রেখে, নির্যাতন করে পাশের দেশে ঢোকানোর মতো অমানবিক নিষ্ঠুর আচরণ পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই।
উল্লেখ্য, গত মার্চে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তড়িঘড়ি করে ৯০ লাখ মানুষের নাম বাদ দিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে। নাম বাদ পড়া এই লোকজন এখন আটক বা বহিষ্কারের ঝুঁকিতে আছেন। এর আগে ২০১৯ সালে আসামে বৈষম্যমূলকভাবে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৯ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিলেন।
ভারত সরকার দাবি করছে, বাংলাদেশিরা অবৈধভাবে সেখানে বাস করছেন এবং তারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চাইলে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে এইচআরডব্লিউর ভাষ্য হলো, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হলেও জোর করে কাউকে তাড়িয়ে দেওয়া বেআইনি। কাউকে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও নথিপত্র কেড়ে নিয়ে বের করে দেওয়া যায় না। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের আটককেন্দ্রগুলোতে শত শত মানুষকে ধরে এনে রাখা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই মুসলিম।