অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততা কিংবা দৈনন্দিন কাজের চাপের মধ্যেই হঠাৎ মোবাইলে একটি এসএমএস আসে—‘আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বার্তার সঙ্গে দেওয়া হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি একটি লিংক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম এবং আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেকেই সেটিতে প্রবেশ করে জরিমানা পরিশোধের চেষ্টা করেন। আর তখনই তারা প্রতারণার শিকার হন।
বিআরটিএর ওয়েবসাইটের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে তৈরি করা একটি ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একাধিক আভিযানিক দল প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হন মো. রাব্বি শেখ (২৪), মো. রিয়াদ হোসেন (৩১) এবং মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১)। রাব্বির বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায়, রিয়াদের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় এবং সাজ্জাদের বাড়ি ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায়।
সিআইডি জানায়, প্রথমে খুলনার বটিয়াঘাটা এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাব্বি শেখকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফেনী থেকে রিয়াদ হোসেন এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে সাজ্জাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, এক ভুক্তভোগী তার মোবাইল ফোনে বিআরটিএর নামে ট্রাফিক জরিমানা ও মামলা সংক্রান্ত একটি এসএমএস পান। বার্তায় থাকা লিংকে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান, তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানা পরিশোধ করলে তা কমে ১ হাজার ৫০০ টাকায় নেমে আসবে বলেও উল্লেখ ছিল।
বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি জরিমানা পরিশোধের জন্য একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি তার স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংকিং অ্যাপের লগইন তথ্য এবং ওটিপি প্রদান করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখতে পান, জরিমানা পরিশোধের পরিবর্তে তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এরপর তিনি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ করেন। একই ধরনের আরও দুটি অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি জানতে পারে, চক্রটি ভুয়া ট্রাফিক মামলা ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে এসএমএসের মাধ্যমে ফিশিং লিংক পাঠাত। পরে ভুক্তভোগীদের ব্যাংক কার্ড, ব্যাংক হিসাব এবং ওটিপি-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করত।
ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।
তদন্তে আরও জানা যায়, প্রতারক চক্রটি বিআরটিএর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের প্রায় হুবহু অনুকরণে একটি ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করেছিল। সরকারি ওয়েবসাইটের মতো দেখতে হওয়ায় অনেকেই সেটিকে আসল মনে করে সেখানে প্রবেশ করতেন। এরপর জরিমানা পরিশোধ কিংবা মামলা যাচাইয়ের নামে নিজেদের ব্যাংক কার্ড, ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য প্রদান করতেন।
চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীদের ওটিপি সংগ্রহ করে ব্যাংক হিসাব ও কার্ড থেকে অননুমোদিত লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করত। তদন্তে এখন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে অন্তত ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে সোপর্দের প্রক্রিয়াও চলমান।
এ ধরনের ফিশিং প্রতারণা সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো কোনো এসএমএস, লিংক বা অনলাইন পেমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরিচিত বা সন্দেহজনক কোনো ওয়েবসাইটে ব্যাংক কার্ডের তথ্য, পিন নম্বর কিংবা ওটিপি শেয়ার না করার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।