ট্রিলিয়নের অর্থনীতি গড়তে তিন স্তরের নকশা প্রণয়ন

এসএম শামসুজ্জোহা

বাণিজ্য

অর্থনৈতিক চাপে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে তিন স্তরের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।নতুন বাজেটে স্বল্প,

2026-06-15T14:01:50+00:00
2026-06-15T14:01:50+00:00
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
বাণিজ্য
সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশল
ট্রিলিয়নের অর্থনীতি গড়তে তিন স্তরের নকশা প্রণয়ন
এসএম শামসুজ্জোহা
সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ২:০১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
অর্থনৈতিক চাপে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে তিন স্তরের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। 

নতুন বাজেটে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে প্রথমে সংকটমুক্ত করা, পরে পুনর্গঠন এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চ প্রবৃদ্ধির নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী এক বছরে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পর তিন বছরের মধ্যে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করা হবে। 

এরপর দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রুপান্তরের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা- ধাপে ধাপে সংস্কার করা গেলে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের পুরো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং আগামী দশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি তৈরি হবে।

ইতোমধ্যে সরকার সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ‘থ্রি-আর’ কৌশল গ্রহণ করেছে। লক্ষ্য হলো- এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানো। পরিকল্পনাটি তিন ধাপে বিভক্ত। 

এগুলো হলো: রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রিস্টোরেশন এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন। যা আগামী আট বছরের মধ্যে ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য মোতাবেক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী জাতীয় ৫৭তম বাজেট ঘোষণা করেছে। 

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, রাজস্ব আহরণ সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতের বিকাশকে প্রধান কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। 

এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, একটি ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সরকার আগামী আট বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চায়।

জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছেছে। সেই অবস্থান থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যকে অর্থনীতির ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সরকার মনে করছে, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি এবং রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো গেলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। 

বাজেট বিশ্লেষণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সে কারণে এবারের বাজেটে ‘ইনভেস্টমেন্ট-ড্রিভেন’ গ্রোথ বা বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। 

শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি গতি ফিরে পেয়েছে এবং ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। 

দেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ ও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরায় প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনাই হবে সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

কারণ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, বিশ্বে মাত্র ২০টি দেশ রয়েছে যাদের অর্থনীতির আকার ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কর সংস্কার, ডিজিটাল রাজস্ব প্রশাসন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে বাংলাদেশকে আগামী কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। 

তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং সেবা খাতকে আগামী দিনের প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা এখনো অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং নীতির ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হবে। 

বিশিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় উপস্থাপিত এই বাজেটকে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি নির্মাণের একটি রূপরেখা হিসেবে দেখছেন। 

তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে।


Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: