দেশের অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারকারীরা বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের অনুসরণ করা হবে এবং কোনোভাবেই শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গভর্নর জানান, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে কিছু সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করতেও সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের সাফল্যের হার দুই শতাংশেরও কম এবং পুরো প্রক্রিয়ায় সাত থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় লাগলেও সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এ প্রচেষ্টা থেকে সরে আসবে না।
মোস্তাকুর রহমান বলেন, যারা দেশের টাকা চুরি করে বিদেশে নিয়ে গেছে, তাদের আমরা শান্তিতে থাকতে দেবো না। ইতোমধ্যে কিছু অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও প্রাথমিক সাফল্য পাওয়া গেছে। উপযুক্ত সময়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গভর্নর বলেন, কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে এবং মোট আমানতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চুরি হয়েছে। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন।
তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা আমানতের টাকা তুলতে পারছিলেন না, তারা এখন ধীরে ধীরে টাকা ফেরত পাচ্ছেন।
গভর্নর বলেন, আমরা ইসলামী ব্যাংককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে চাই। ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে জরুরি তারল্য সহায়তাও দেওয়া হবে।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে মোস্তাকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংককে ঋণ বিতরণ, বদলি বা পদোন্নতির নির্দেশ দেয় না। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
তিনি জানান, ব্যাংকটির অ্যাডভান্স-ডিপোজিট (এডি) রেশিও ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৯৩ শতাংশ থাকলেও চলতি বছরের মার্চে তা ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশে পৌঁছায়, যা অস্বাভাবিক। এ হার কমাতে ব্যাংকটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন গভর্নর। তবে তিনি বলেন, এটি একটি সিস্টেমিক ব্যাংক হওয়ায় বোর্ডের কার্যক্রম সচল রাখতে দ্রুত নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা যে কোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন।
গভর্নর জানান, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় থাকা কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)-এর সংকট সমাধানেও কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যারা ১০ থেকে ১২ বছর ধরে জমা অর্থ ফেরত পাচ্ছিলেন না, তাদের জন্য আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট।