প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়াটি কার্যকর হলে এটি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলছে, নতুন খসড়ায় এমন কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে খসড়াটি সংশোধনের জন্য ১৯ দফা সুপারিশ দিয়েছে টিআইবি এবং চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা করার আহ্বান জানিয়েছে।
৮ জুন সরকারের কাছে সুপারিশমালা জমা দেওয়ার পর বুধবার (১০ জুন) এক বিবৃতিতে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে সংস্থাটি।
টিআইবির মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন খসড়ায় এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে, যা একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠনের জন-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘প্যারিস নীতিমালা’র সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
খসড়ায় কমিশনের স্বাধীনতা সংক্রান্ত পূর্বের স্পষ্ট উল্লেখ—যেখানে বলা ছিল কমিশন কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন থাকবে না—তা বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে টিআইবি। এতে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বাড়বে এবং কমিশনের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত বাছাই কমিটির গঠন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। খসড়া অনুযায়ী এই কমিটিতে থাকবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার, দুইজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
টিআইবির মতে, এ কাঠামোতে সরকারি দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি রয়েছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ বাছাই প্রক্রিয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি নিয়েও সংশোধনের সুপারিশ করেছে টিআইবি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও আটককেন্দ্রে অবাধ অনুসন্ধান ও পরিদর্শনের ক্ষমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুম, নির্যাতন ও বেআইনি আটকের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের বিধান স্পষ্ট করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগাম সরকারি অনুমতির বাধ্যবাধকতা বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনে নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ সীমিত করা, যোগ্যতা ও দলনিরপেক্ষতার কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ এবং কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবিও তুলেছে টিআইবি।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন কার্যকরভাবে কাজ করতে না পারলে তা শুধু মানবাধিকার পরিস্থিতিকেই নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।