চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের খবরে ফের সরব হয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। একই স্মারক নম্বরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জারি করা দুটি পৃথক চিঠিতে ভিন্ন নির্দেশনা দেওয়ায় এনসিটি ইজারা ইস্যুতে নতুন করে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে বুধবার (১০ জুন) এনসিটি ইজারা না দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)।
জানা গেছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে গত ৪ জুন জারি করা দুটি চিঠিকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়। একটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা (নেগোসিয়েশন) এগিয়ে নেওয়া অথবা প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহী না হলে পুরো প্রক্রিয়া বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। অন্যদিকে একই স্মারক নম্বরে জারি করা আরেকটি চিঠিতে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই বিষয়ে ভিন্নধর্মী নির্দেশনা আসায় বন্দর অঙ্গনে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগের প্রতিবাদে বুধবার চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে স্কপের উদ্যোগে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সংগঠনটির নেতারা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।
চট্টগ্রাম স্কপের যুগ্ম সমন্বয়কারী এস কে খোদা তোতনের সভাপতিত্বে এবং অপর যুগ্ম সমন্বয়কারী ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি খোরশেদ আলম, বিএফটিইউসির সাধারণ সম্পাদক কে এম শহিদুল্লাহ, বিএলএফের সভাপতি নুরুল আবছার তৌহিদ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের হেলাল উদ্দিন কবির, ডক শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন ও সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিমসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শ্রমিক ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টার্মিনাল পরিচালনার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। সে সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও স্কপের আন্দোলনের কারণে বন্দর কার্যক্রমে অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দেয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত এনসিটি প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ। এখানে একসঙ্গে পাঁচটি ছোট-বড় জাহাজ নোঙর করতে পারে। টার্মিনালটিতে চারটি জেটি রয়েছে এবং বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় অর্ধেকই এ টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ইয়ার্ড, ১৪টি গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং কনটেইনার স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জামসহ সব ধরনের অবকাঠামো এখানে বিদ্যমান।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, এনসিটির সকল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক টার্মিনালটির কার্যক্রম পরিচালনা করলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটিকে সরিয়ে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পর থেকেই বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে না দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন মহল সরব হয়ে ওঠে। আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।