মধ্যরাতে একটি ফোনকল। ওপাশ থেকে নিজেকে ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলা হলো, ‘আপনার অ্যাকাউন্টটি ঝুঁকিতে আছে, দ্রুত ওটিপি দিন।’ কয়েক মিনিট পরই উধাও হয়ে গেল সঞ্চিত অর্থ। অন্যদিকে, কলেজছাত্রী নুসরাত হঠাৎ দেখতে পেলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নামে ছড়িয়ে পড়েছে আপত্তিকর ছবি। পরে জানা গেল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে সেই ছবি। আবার কোথাও অনলাইন গেমের আড়ালে চলছে জুয়ার আসর, কোথাও ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী যত দ্রুত মানুষের হাতের মুঠোয় এসেছে, অপরাধের কৌশলও ততটাই আধুনিক হয়েছে। অপরাধ এখন আর শুধু অন্ধকার গলি কিংবা নির্জন সড়কে সীমাবদ্ধ নয়; তা প্রবেশ করেছে মানুষের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল পরিচয়ের ভেতর। ফলে অপরাধের নতুন এক সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, যার বড় অংশই পরিচালিত হচ্ছে স্ক্রিনের আড়াল থেকে।
অপরাধের নতুন রাজধানী এখন সাইবার জগৎ : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ধরন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এর ভয়াবহতাও। একসময় হ্যাকিং বা কম্পিউটার ভাইরাসকে সাইবার অপরাধের প্রধান রূপ মনে করা হলেও এখন এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। অনলাইন ব্যাংকিং জালিয়াতি, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতারণা, পরিচয় চুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, ডিপফেক ভিডিও তৈরি, অনলাইন জুয়া, ভুয়া বিনিয়োগ প্রকল্প, র্যানসমওয়্যার হামলা, সব মিলিয়ে সাইবার অপরাধ এখন দেশের অন্যতম বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি যত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হচ্ছে, অপরাধীরাও তত নতুন সুযোগ খুঁজে পাচ্ছে।
প্রতারণার ফাঁদে সাধারণ মানুষ : বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে অনলাইন আর্থিক প্রতারণা। প্রতারকরা কখনো ব্যাংকের কর্মকর্তা, কখনো বিকাশ বা নগদের প্রতিনিধি, আবার কখনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী পরিচয়ে যোগাযোগ করছে। একটি ফোনকল, একটি মেসেজ কিংবা একটি লিংকে ক্লিক, এসবের মাধ্যমেই মুহূর্তে খালি হয়ে যাচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষকে অর্থ লগ্নির প্রলোভন দেখানো হয়। কয়েকদিন লাভ দেওয়ার পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় পুরো প্ল্যাটফর্ম। সাইবার অপরাধ তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতারণার এই চক্রগুলো অত্যন্ত সংগঠিত। তাদের অনেকেই দেশের বাইরে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করে, ফলে তদন্তও হয়ে ওঠে জটিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোগাযোগের মাধ্যম নাকি অপরাধের অস্ত্র? ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা ইউটিউব মানুষের যোগাযোগ ও বিনোদনের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এসব প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে। এরই মধ্যে ভুয়া আইডি খুলে পরিচয় গোপন করে প্রতারণা, ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল, কিশোর-কিশোরীদের ফাঁদে ফেলা, গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং চরিত্রহননের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে অর্থ দাবি করা হয়। সামাজিক সম্মানের ভয়ে অধিকাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগও করেন না। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি শুধু আর্থিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেও গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক ভুক্তভোগী হতাশা, উদ্বেগ এমনকি আত্মহত্যার দিকেও ধাবিত হচ্ছেন।
এআই : আশীর্বাদ নাকি নতুন আতঙ্ক? বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। কিন্তু এর অপব্যবহারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বর্তমানে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের মুখমন্ডল, কণ্ঠস্বর এমনকি পুরো ভিডিও পর্যন্ত নকল করা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে কাউকে ফাঁসানো, সুনাম ক্ষুণ্ন করা কিংবা অর্থ আদায়ের মতো অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সম্প্রতি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের উদ্যোগ ডিসমিসল্যাবের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত পরিচয়পত্র তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। সেখানে নাম, জন্মতারিখ, পরিচয় নম্বর, স্বাক্ষরসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবর্তন করা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি পরিচয় জালিয়াতির জন্য নতুন এক বিপজ্জনক দুয়ার খুলে দিয়েছে। কারণ, ভবিষ্যতে শুধু ছবি নয়, মানুষের কণ্ঠস্বর কিংবা ভিডিও ব্যবহার করেও প্রতারণা করা সম্ভব হবে।
গুজবের কারখানা ও বট বাহিনী : ডিজিটাল যুগে তথ্যের গতি আলোর চেয়েও দ্রুত। কিন্তু সেই তথ্য যদি মিথ্যা হয়, তাহলে তার ক্ষতিও হতে পারে ভয়াবহ। প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক পোস্ট প্রকৃত ব্যবহারকারীর নয়; বরং স্বয়ংক্রিয় বট অ্যাকাউন্ট দ্বারা পরিচালিত। এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গুজব, বিভ্রান্তি এবং অপপ্রচার চালানো হয়। অতীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্যের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। ফলে প্রযুক্তির অপব্যবহার এখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবৈধ ডিভাইসের অন্ধকার নেটওয়ার্ক : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক অবৈধ ও ক্লোন মোবাইল ফোন সক্রিয় রয়েছে। এসব ডিভাইসে ভুয়া বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করা হয়। তদন্তকারীদের মতে, অপরাধীরা এসব ফোন ব্যবহার করে সহজেই পরিচয় গোপন রাখতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণা কিংবা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরও ডিভাইস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে অবৈধ মোবাইল ফোন শনাক্ত ও বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
তরুণদের টেনে নিচ্ছে অনলাইন জুয়া : প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকগুলোর একটি হলো অনলাইন জুয়ার বিস্তার। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে তরুণদের একটি অংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় বিভিন্ন অনলাইন বেটিং ও জুয়ার প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে। প্রথমদিকে সামান্য লাভ দেখিয়ে তাদের আসক্ত করা হয়। পরে হারিয়ে যায় বিপুল অর্থ। তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে এসব প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্যও মিলেছে। ফলে এটি শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
কেন বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ? বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কারণকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন, এরই মধ্যেÑ ডিজিটাল সচেতনতার ঘাটতি, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় অসতর্কতা, দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করার প্রবণতা, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, অপরাধীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তা সংস্কৃতির অভাব। অনেক ব্যবহারকারী এখনও বুঝতে পারেন না যে একটি ওটিপি, একটি স্ক্রিনশট বা একটি ব্যক্তিগত তথ্যই তাদের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞদের মত, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় শুধু গ্রেপ্তার বা আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা কার্যক্রম এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার সচেতনতা বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাইবার অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও আরও আধুনিক হতে হবে। এজন্য বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট, উন্নত ফরেনসিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
ডিজিটাল ভবিষ্যতের সামনে বড় প্রশ্ন : বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সেবা থেকে ব্যাংকিং, শিক্ষা থেকে ব্যবসা, সবখানেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে যদি প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে উন্নয়নের সুফল অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। কারণ আজকের বাস্তবতা হলো, অপরাধীরা আর সবসময় অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামে না। অনেক সময় তারা বসে থাকে একটি কম্পিউটারের সামনে, একটি স্মার্টফোনের আড়ালে কিংবা একটি ভুয়া প্রোফাইলের পেছনে। আর সেখান থেকেই পরিচালনা করে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ও সাইবার হামলার বিশাল সাম্রাজ্য।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য। কিন্তু সচেতনতা, নিরাপত্তা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সেই প্রযুক্তিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় হুমকি। ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে তাই এখনই প্রয়োজন প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ।