বাজেটে নাগরিক সেবায় সরকারের মহাপরিকল্পনা

এসএম শামসুজ্জোহা

জাতীয়

সরকারের নতুন বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও গৃহিণীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। মূল্যস্ফীতি

2026-06-04T12:17:23+00:00
2026-06-04T12:17:23+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
  ই-পেপার   
           
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
পূর্ণাঙ্গ ‘কল্যাণ রাষ্ট্রের’ লক্ষ্য
বাজেটে নাগরিক সেবায় সরকারের মহাপরিকল্পনা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে যুগান্তকারী তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এসএম শামসুজ্জোহা
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ১২:১৭ পিএম 
ফাইল ছবি
সরকারের নতুন বাজেটে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও গৃহিণীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এক যুগান্তকারী ও কাঠামোগত রূপান্তর আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাময়িক অনুদান নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের আজীবন রাষ্ট্রীয় অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘কল্যাণকর রাষ্ট্রে’ রূপান্তর করাই এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি নাগরিককে মাথায় রেখে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। এবারের বাজেট ভালো হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে চিন্তায় রেখে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। আমাদের খারাপ সময়, ভঙ্গুর অর্থনীতি তার মধ্যে আমরা চেষ্টা করেছি, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কথা চিন্তা করেছি। সবাইকে মাথায় রেখে বাজেট দেওয়া হবে- ইনশাআল্লাহ।

সরকারের ওপর প্রচুর ঋণের বোঝা জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ বলেন, সবদিক থেকে অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও এই অবস্থার মধ্যে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। এরপরও বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে মাথায় রেখে বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কারণ, বাজেটের এই অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ যাতে নিশ্চিত করতে পারি এবং অর্থনীতির সুফল যাতে প্রত্যেকটি নাগরিকের কাছে যায় সেগুলো মাথায় রেখে প্রণয়ন করার চেষ্টা করেছি। মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা থেকে জানা গেছে, আগামী অর্থবছর থেকেই দেশে চালু হচ্ছে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’। ‘ওয়ান পার্সন, ওয়ান অ্যাকাউন্ট’ (এক ব্যক্তি, একটি অ্যাকাউন্ট) নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা আধুনিক এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমেই মূলত বহুপ্রতীক্ষিত ‘লাইফ-সাইকেলভিত্তিক’ (আজীবন) সামাজিক নিরাপত্তা মডেল বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার।

 নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সাময়িক থোক বরাদ্দের সনাতনী বৃত্ত ভেঙে প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্রীয় অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এটিই হবে বাংলাদেশের বড় মাইলফলক। এছাড়াও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে বাঁচাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে ফেলতেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসছে বাজেটে অবকাঠামো খাতের চেয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সাজানো এই রূপরেখা। এতে করে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। 

তবে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই বিনিয়োগ বাড়বে না, এজন্য প্রয়োজন সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসাবান্ধব প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ- এমনটিই মনে করছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদের মতে, আসন্ন বাজেট, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, করব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনীতির সামগ্রিক ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান থাকতে হবে। পাশাপাশি করনীতির সরলীকরণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়নও জরুরি।

অর্থ মন্ত্রণালয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্যই ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর ব্যয়ও বড় পরিসরে বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে নগদ সহায়তা খাতে প্রায় ২৩ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও নতুন অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে আগামী বাজেটে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। শুরুর দিকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলেও ২০৩২ সালের মধ্যে ধীরে ধীরে সব নাগরিকের জন্য সর্বজনীন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চায় সরকার।

তবে সামাজিক সুরক্ষা খাতের সামগ্রিক বরাদ্দ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কারণ, বাজেট প্রণয়নের শেষ পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতা, ভাতার পরিমাণ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা নিয়ে আরও পর্যালোচনা চলছে। সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েকটি নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হবে। সর্বশেষ প্রায় ৭২ হাজার পরিবার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। এখন সেটিকে এক লাফে ৪১ লাখ পরিবারে উণ্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে চাইছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামাল দিতে সহায়তা করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। শুধু ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিই নয়, বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতা ও সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হবে। এর মধ্যে কৃষকদের জন্য আলাদা সহায়তা কার্ড চালুর চিন্তাভাবনা রয়েছে। এছাড়া খাল খননসহ গ্রামীণ কর্মসংস্থানভিত্তিক কিছু কর্মসূচিও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

তবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন, বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে এই কর্মসূচিতে সময়োপযোগী সংস্কার আনার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির সুবিধা বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এই পুরো ব্যবস্থায় দ্রুত স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, যাতে কেবল প্রকৃত উপকারভোগীরাই এই সুবিধার আওতায় আসতে পারেন এবং তা নিশ্চিত করা জরুরি।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: