বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার খরনা ইউনিয়নের ভাদাইকান্দি গ্রামে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট মব আতঙ্কে গত প্রায় ১০ মাস ধরে ৫টি বাড়ির ১৩টি পরিবারের অন্তত ৬০ সদস্য নিজ ভিটে-মাটিতে ফিরতে পারছেন না। নিরাপত্তাহীনতার কারণে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ এসব পরিবারের সদস্যরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমনকি তারা নিজ বাড়িতে ঈদও উদযাপন করতে পারেননি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় জাহিদ হাসান ওরফে জার্জিস (৩৮) ও তার নেতৃত্বাধীন একটি কিশোর গ্যাং আল আমিন নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ওপর মব সৃষ্টি করে। এরপর আসামিদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়। গোয়ালের গরু-ছাগল পর্যন্ত নিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় আদালতে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর আবুল খায়ের নামে এক ট্রাকচালককে মারধরের ঘটনায় হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই আবুল খায়ের ও আল আমিনের মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষ হলে গুরুতর আহত আল আমিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ আগস্ট মারা যান। নিহত আল আমিন জার্জিসের ভাতিজা। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় পূর্বশত্রুতার জেরে নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, “ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তারপরও আমার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভয়ে জমিতে চাষাবাদও করতে পারছি না।”
আলহাজ নুরুল ইসলাম (৭৮) জানান, তার প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, “৪০ বিঘা জমি অনাবাদী পড়ে আছে। ভয়ে এখনো বাড়ি ফিরতে পারছি না।”
গৃহবধূ হাসনা হেনা বলেন, “তিন সন্তানকে নিয়ে অন্যের আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছি। সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রশাসনের নিরাপত্তা পেলে দ্রুত বাড়ি ফিরতে চাই।”
দাখিল পরীক্ষার্থী আম্বিয়া খাতুন বলেন, “ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, গরু পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে। অন্যের বাড়িতে আশ্রিত থেকে পরীক্ষা দিচ্ছি। কোনো অপরাধ না করেও আমরা মবের শিকার।”
অভিযোগের বিষয়ে জাহিদ হাসান জার্জিস বলেন, “কেন এসব হয়েছে তা গ্রামে এসে শুনে বিচার করে তারপর বলবেন।” কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোনে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
শাজাহানপুর থানার এসআই আব্দুর রহিম বলেন, “২০২৫ সালের ২ আগস্ট ৯৯৯-এর কল পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি কয়েকটি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। আতঙ্কিত নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সরিয়ে নিতে গেলে আমরাও মবের মুখে পড়ি।”
শাজাহানপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশিক ইকবাল বলেন, ঘটনার বিষয়ে অবগত হয়েছি। পুলিশের পক্ষে প্রতিটি বাড়িতে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মব করে কেউ পার পাবে না, তদন্ত করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।