ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত ও ভ্রমণের কারণে ঈদের পর দেশে হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আক্রান্ত শিশুদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ঈদের সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
এদিকে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে এবং একজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর র্যাশ বা গুটি ওঠার অন্তত চার দিন আগ থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। ফলে ঈদযাত্রার ভিড়, গণপরিবহন ও জনসমাগমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলা এবং সামান্য জ্বর-সর্দি থাকলেও ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদের সময় মানুষ শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করবে, এতে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। তিনি অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অসুস্থ বা দুর্বল শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ না করাই ভালো।
আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন বলেন, যাদের শরীরে হামের ভাইরাস রয়েছে তারা উপসর্গ প্রকাশের আগেই অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দিতে পারে। তাই পরিবারের কারও জ্বর, সর্দি বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম জানান, অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে শুধু হালকা জ্বর দেখা যায়, কিন্তু তখন থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। ফলে ঈদযাত্রা ও বড় ধরনের জনসমাগমে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, গ্রামে গিয়ে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশবে। কে আক্রান্ত আর কে নয় তা সহজে বোঝা যায় না। এতে সুস্থ শিশুরাও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। সেই বাতাসে শ্বাস নিলেও সংক্রমণ হতে পারে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশুদের নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে না যাওয়াই নিরাপদ। ঈদের সময় মানুষের মেলামেশা বাড়ায় সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়বে।
চিকিৎসক-নার্সদের ছুটি বাতিল
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঈদের ছুটিকালীন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ড ও হাম আইসোলেশন ইউনিটে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত রাখতে বলা হয়েছে। যেসব হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা চলছে, সেসব হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের রোগী ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কোনো চিকিৎসক বা নার্সের ছুটি হবে না। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ঈদের ছুটিতেও চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি অভিভাবকদের আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ভিড় এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান।
তবে জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, শুধু ঈদযাত্রাই নয়, সংক্রমণ বৃদ্ধির বড় কারণ হলো পর্যাপ্ত টিকাদান নিশ্চিত না হওয়া। তার মতে, দেশের সব এলাকায় এখনো ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। যেসব এলাকায় টিকার হার কম, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
৭১ দিনে মৃত্যু ৫৪৫
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৭১ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৫৪৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে এবং ৮৭ জনের হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১২৭ জন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৭ শিশু। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪২৭ জন ঢাকা বিভাগের। এছাড়া চট্টগ্রামে ২০৮, বরিশালে ১২৮ ও খুলনায় ৯৫ শিশু ভর্তি হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৯৪০ জনে। এদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৫ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৭১৯ জন।