এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হচ্ছে না। ফলে এ নির্বাচনে দলীয় প্রতিকও থাকছে না। মূলত গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলীয়ভাবে দুই বার স্থানীয় সরকার নির্বাচন করায় ব্যাপক সংঘাতে অন্তত ২৫৯ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছিলো।
এছাড়া, মনোনয়ন বাণিজ্যও হয়েছিল অনেক ফলে আর যাতে এমন ঘটনা না ঘটে এজন্য গত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না করতে আইন সংশোধন করেন। তবুও দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বিচ্ছিন্নভাবে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। আর জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তপশিলের পর দলসমর্থিত প্রার্থী ঠিক করবে বলে জানা গেছে। ফলে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতীতের ন্যায় ফের সংঘাত ও প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে ধাপে ধাপে হবে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন। এ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বাতিল হওয়ায় ভিন্ন আয়োজনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বন্ধ করেছে। পরে সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হয়। ফলে নির্দলীয়ভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) নির্বাচনি প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিকদল তাদের প্রার্থী ঘোষণা করায় বিপাকে পড়েছেন ইসি। এ বিষয়ে সম্প্রতি উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা থাকাকালীন ২০১৫ সালে তড়িগড়ি করে আইন সংশোধন করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান করা হয়। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় স্থানীয় নির্বাচন উৎসবমুখর করতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিন্তু পর্যায়ক্রমে স্থানীয় নির্বাচন উৎসব থেকে সংঘাতে পরিণত হয়। এ নির্বাচনককে কেন্দ্র করে শতাধিক নেতাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে ১৪৬ জন নিহতের ঘটনা ঘটেছে। আর এটি ছিল নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত ভোট। এরপর আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও স্বতন্ত্রদের সংঘর্ষে ২০২১ সালেও ইউপি নির্বাচনে দেশজুড়ে ১১৩ জন নিহতের ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয় দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় স্থানীয় নির্বাচনেও মনোনয়ন বাণিজ্যও কম হয়নি। তখন আওয়ামী লীগের এমপি এবং নেতাদের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন বিক্রির অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে সংঘাত এড়াতে সব দিক বিবেচনা করেই গত অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে না করে নির্দলীয়ভাবে করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিকদলগুলোর পক্ষ থেকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করার ফের সংঘাত-প্রাণহানির হাতছানি লক্ষ্যে করা যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে যেভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও নিহতের ঘটনা ঘটেছে ফের যদি দলীয়ভাবে এ নির্বাচন হয় তাহলে আবারো একই ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কারণেই সবার দাবি ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে করা। এজন্যই গত অন্তবর্তীকালীন সরকার এ ব্যবস্থা ফের চালু করে। যাতে সংঘাত ও প্রভাব বিস্তার না থাকে, আগের মতো উৎসবমুখর হয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে প্রার্থী ঘোষণা শুরু করেছ তাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগের নির্দলীয় চরিত্র হাতে পারে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন বাতিলের মূল লক্ষ্যই ব্যাহত হবে। ফলে এ বিষয়ে দলগুলোকে আরো সহনশীল হতে হবে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে ধাপে ধাপে হবে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন। প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন করার চিন্তা রয়েছে সরকারের। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট শেষ হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ-এই পাঁচ স্তরের নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। কিন্তু কিছু দল প্রার্থী ঘোষণা করায় এ নির্বাচন ভেস্তে যাবে কি না সে বিষয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের কাছে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদসহ বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা সব দল প্রস্তাব করেছেন স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে হতে হবে। জুলাই সনদেও একই প্রস্তাব রয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিধান বাদ দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করে। এই চারটি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার। তবুও দলীয় প্রার্থী ঘোষণায় নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
জানা যায়, সংসদ নির্বাচনের পর সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। এরপার থেকেই জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন দল দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি করে আসছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে না হলেও নানাভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিমউদ্দিন ও দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েমের নাম আলোচনায় রয়েছে। ঢাকায় জামায়াতের পদধারী নেতারা দলীয় সমর্থিত প্রার্থী পরিচয়ে কাউন্সিলর পদের জন্য প্রচার চালাচ্ছেন। জামায়াত স্থানীয়ভাবে উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থীও ঠিক করেছে, তারা এখণ ভোটের প্রচারও চালাচ্ছেন। এনসিপি পাঁচ সিটি করপোরেশন এবং ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় দল-সমর্থিত প্রার্থী ঘোষণা করেছেন আরো আগেই।
এছাড়া, ইসলামী আন্দোলন ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে দলের প্রার্থী করা হয়েছে ইসলামী যুব আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান মুজাহিদ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ।
এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাদের বলেন, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। আমরা চাই স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয়ভাবেই হোক। আর নির্দলীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় নির্বাচনের পক্ষে জামায়াতেরই প্রথম প্রস্তাব করেছে। ফলে এ নিয়ে জামায়াত সেই অবস্থানেই রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, দলীয় হোক আর নির্দলীয় হোক সারাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে অংশগ্রহণ করবে। কোনো জোটের সাথে আমরা নির্বাচন করবো না। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয়ভাবেই হবে। তবে দলের ভূমিকা সমর্থনে সীমাবদ্ধ থাকবে। মূলত নেতাকর্মীদের প্রস্তুতির জন্যই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে ।