সাংবাদিক আর্থার মিলার বলেছেন, ‘একটি ভালো সংবাদপত্র নিজেই দেশের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে’। আর সেটি সম্ভব হয় প্রকাশক, সম্পাদক, প্রতিবেদকসহ সংশ্লিষ্ট সবার মিলিত প্রচেষ্টায়। আর সংবাদপত্রের কাজই হলো রাষ্ট্র ও সরকারের অসঙ্গতি অব্যবস্থাপনাকে তুলে ধরা। সেক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। সূর্যের আলো যেমন পৃথিবীকে আলোকিত করে সংবাদপত্রও মানুষকে আলোকিত করে নানা বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করে। যে কারণে একজন দার্শনিক বলেছেন, পৃথিবীতে প্রতিদিন দুটো সূর্য ওঠে। একটি প্রকৃতির সূর্য আরেকটি সংবাদপত্রের সূর্য। সংবাদপত্রের সূর্যই রাষ্ট্রকে পথ নির্দেশ করে।
চারিদিকের সংবাদ জানার আকাক্সক্ষা মানুষের সহজাত। তাই সংবাদ আদান প্রদানের মাধ্যম সংবাদপত্রের চাহিদা বহু কাল ধরেই। তাই এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের মর্যাদা লাভ করেছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক ঘটনাবলির সরেজমিন প্রতিবেদন জনগণের সামনে উপস্থাপনের দায়িত্ব সংবাদপত্রের। সেটা প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়ের। এই কাজে একজন সাংবাদিক সাহসের সঙ্গে সত্য ও ন্যায়ের পথে সচল রাখেন তার কলমকে। এখানে তার সততা নিষ্ঠা আন্তরিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে মফস্বল সাংবাদিকতা।
এ কথা অস্বীকার করার কোনো জো নেই যে, আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপান্তর কার্যক্রমে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মফস্বল সাংবাদিকতার অবদানও যথেষ্ট গুরুত্ববহ। প্রতিনিয়ত জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি তার কর্ম এলাকার অবহেলিত, উন্নয়নবঞ্চিত জনপদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। খুন, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, অশিক্ষা, অপচিকিৎসা, যৌতুক, গ্রামের সরল মানুষদের নানাভাবে প্রতারিত হওয়া, জবরদখল, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দলাদলি, অগ্নিকান্ড, পাহাড়ধস, বিদ্যুতের লোডশেডিং ইত্যাদির শিকার হওয়া মানুষগুলোর পক্ষে কথা বলেন। সে দিক থেকে তার কাজটি মানুষের কল্যাণে নিবেদিত।
পত্রিকার প্রধান অফিসগুলোতে বিভাগভিত্তিক আলাদা আলাদা রিপোর্টার থাকলেও মফস্বল সাংবাদিকদের মধ্যে কোনো বিভাগ ভাগ করা নেই, তাই তাদের প্রতিটি বিষয়েই সংবাদ ও প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এতে তার দক্ষতাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। মফস্বল সাংবাদিকরা চতুর্মুখী যে শ্রম দেন তার বিনিময়ে তারা তেমন কিছুই পান না। একটু দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে আমাদের সংবাদপত্রের প্রথমপাতা থেকে শুরু করে শেষ পাতা পর্যন্ত মোট নিউজের ৭৫ ভাগ সরবরাহ করেন ঢাকার বাইরের সাংবাদিকেরা। প্রথম পাতার গড়ে ৪০ শতাংশ নিউজও তাদেরই পাঠানো। অথচ তাদের প্রাপ্তি খুব সামান্য। গণমাধ্যমের ভিতরের এসব মানুষের এই যে পরাধীনতা সেদিকে না তাকিয়ে মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা নিছক আকাশ কুসুম কল্পনা। মফস্বলের যারা সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বেতনভাতা পান, তাদের বেতনভাতা বৃদ্ধি ও যাদের বেতনভুক্ত করা হয়নি তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা নূ্যূনতম স্নাতক হওয়া উচিত। এটি করা হলে অপসাংবাদিকতা অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে।
তবে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় সত্য যে সঠিক প্রশিক্ষণ, পেশাদারত্বের অভাব, অধিক টাকার লোভ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সাংবাদিকদের মাঝে বিভক্তি বাড়ছে। অন্যদিকে অনেক সময় সাংবাদিকদের কাউকে কাউকে সাংঘাতিক, হলুদ সাংবাদিক, চাঁদাবাজ সাংবাদিক, সিন্ডিকেট সাংবাদিক, বিজ্ঞাপন সাংবাদিক, রাজনৈতিক সাংবাদিক, গলাবাজ সাংবাদিক, ক্রেডিট পরিবর্তন সাংবাদিক, দালাল সাংবাদিক ইত্যাদি নেতিবাচক ভাষায় অভিহিত করা হয়। এর অবসান হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা ও মিডিয়াগুলোর কর্তৃপক্ষের স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা পরিত্যাগ করে কর্মদক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করি।
মফস্বল সাংবাদিকদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন মুখ্য বিষয় হওয়া উচিত। সুতরাং তাদেরকে নিবেদিতপ্রাণ, পরিশ্রমী, সময়ানুবর্তী, সাহসী, কৌতূহলী, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রখর স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন, দল নিরপেক্ষ, সৎ, ধৈর্যশীল এবং রস ও সাহিত্যবোধ সম্পন্ন হতে হবে।
সাংবাদিকতাকে পেশা কিংবা নেশা হিসেবে নেওয়া ও অধিক পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীরা নানা গুণাবলি চর্চার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সফল সাংবাদিক হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারেন। এছাড়া পেশাদারত্ব অর্জনের জন্য দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখাটাও জরুরি। জনগণ চায় সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে হলুদ সাংবাদিকতার অবসান হোক।
সংবাদপত্রের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা হচ্ছে সাংবাদিকদের লেখনী সমাজের আয়নায় পরিণত হোক, যা দেখে সমাজের মানুষ সচেতন হবে। পাশাপাশি অপরাধমূলক সংবাদ পড়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে যাতে সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়। এলাকার অন্যায়, অত্যাচার, বঞ্চনা, শোষণের বিপক্ষে সাংবাদিকের কলম ও ক্যামেরা যথাযথ কাজ করুক ও ভালো কাজের প্রশংসার বাস্তবচিত্র ফুটে উঠুক, মফস্বল সাংবাদিকতার দ্বারা সমাজ উপকৃত হোক। মফস্বল সাংবাদিক দেশের ৮৫ ভাগ মানুষের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও অভাব-অভিযোগের খবর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে পত্রিকায় পাঠিয়ে থাকেন, তাদের খোঁজখবর পত্রিকার মালিক/সম্পাদক একটু কমই রাখেন বা রাখতে পারেন। আবার এমন কিছু সংবাদ আছে যা সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের পরোক্ষ হুমকি, প্রভাবশালীদের চোখ রাঙানি, এমনকি প্রাণনাশের মতো আশঙ্কাও থাকে। তারপরও থেমে নেই মফস্বল সাংবাদিকদের পথচলা। তবে এখন সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের মানোন্নয়ন হয়েছে নিঃসন্দেহে।
তবে এখন হাতের মুঠোয় সব যোগাযোগ। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়েছে। কদর বেড়েছে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের। বর্তমানে সাংবাদিকতার ধরন পাল্টেছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে। এখন আর প্রিন্ট হওয়া সংবাদপত্রের খবরের জন্য কেউ বসে থাকে না। মানুষ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো মুহূর্তের মধ্যেই পেয়ে যাচ্ছে।
দেশের সংবাদ মাধ্যম যত শক্তিশালী হবে রাষ্ট্রের ভিত তত মজবুত হবে। যে কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবাদপত্রকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রের এই ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাই বিধ্বস্ত হবে। ন্যায়বিচার, সুশাসন ও উন্নয়ন গতি হারাবে। সাংবাদিকের কলম ন্যায়ের প্রতীক হয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে দল-মত নির্বিশেষে সকলের ভুলত্রুটি শুধরে নিতে সাহায্য করে। আলোচনা-সমালোচনার ভেতর দিয়ে জাতীয় সব ইস্যু মীমাংসায় পথ দেখায় এবং সর্বস্তরের রাজনীতিকেও পরিশুদ্ধ করে তুলকে সহায়তা করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল সুদৃঢ় রাখতে সংবাদপত্রের ভূমিকাকে অস্বীকারের উপায় নেই। সুতরাং সংবাদপত্রের স্বাধীন মতপ্রকাশে প্রতিবন্ধকতা দূর করে সাংবাদিকদের কলমকে মুক্ত ও সচল রাখতে দলমত নির্বিশেষে পরমতসহিষ্ণুতাও কাম্য। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতাকে নিষ্কণ্টক করতে বর্তমান সময়ে এই গণতান্ত্রিক চর্চার ধারা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক