ঋণের চাপে স্কুল ছাড়ছে সন্তান, এলাকা ছাড়ছেন কৃষক

অনলাইন ডেস্ক

সারাদেশ

দীর্ঘ এক মাসের বেশি বৃষ্টির পর হাওরে এখন ঝলমলে রোদ। কিন্তু সেই রোদ কৃষকের মনে স্বস্তির বদলে বাড়িয়ে দিচ্ছে কষ্ট।

2026-05-09T19:04:36+00:00
2026-05-09T19:04:36+00:00
 
  শনিবার, ৯ মে ২০২৬,
২৬ বৈশাখ ১৪৩৩
  ই-পেপার   
           
শনিবার, ৯ মে ২০২৬
সারাদেশ
ঋণের চাপে স্কুল ছাড়ছে সন্তান, এলাকা ছাড়ছেন কৃষক
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ৭:০৪ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ এক মাসের বেশি বৃষ্টির পর হাওরে এখন ঝলমলে রোদ। কিন্তু সেই রোদ কৃষকের মনে স্বস্তির বদলে বাড়িয়ে দিচ্ছে কষ্ট। স্বপ্নের বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এই রোদ এখন তাদের কোনো কাজে আসছে না। হাওরের ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। অনেকেই নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান থেকে যা বাঁচানো গেছে, তা শুকিয়ে রাখছেন। তবে কৃষকের মনে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ঋণ। ঋণ করে চাষাবাদ করা অনেক কৃষক আগেভাগেই এলাকা ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন।

এ চিত্র সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলজুড়ে। কৃষকদের ভাষ্য, এক একর জমিতে চাষ করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। অনেক বর্গাচাষি ৮ থেকে ১০ একর পর্যন্ত জমি করেছেন। ফলে বেশি জমি মানেই বেশি ঋণ। এখন সেই ঋণের চাপ সামলাতে না পেরে অনেকে এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরের রৌয়ারপাড় এলাকায় সড়কের পাশে অল্প কিছু ধান শুকাচ্ছিলেন হাছনপছন্দ গ্রামের কৃষক ইনচান আলী। তিনি এবার প্রায় আট একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। ধানের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এক কাঠা জমির ধানও কাটতে পারিনি। শিয়ালমারা হাওরে সব জমি পানির নিচে চলে গেছে।”

চাষাবাদের জন্য বিভিন্নজনের কাছ থেকে তিনি সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল চিকিৎসা খরচও। ইনচান আলী বলেন, “৬০০-৭০০ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল। তাহলে ঋণ শোধ করতে সমস্যা হতো না। এখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে।”

যে ধান তিনি শুকাচ্ছিলেন, সেটিও তাঁর নিজের নয়। তিনি বলেন, “আমি কোনো ধান কাটতে পারিনি। অন্যদের ধান শুকাতে সাহায্য করছি।” তাঁর দাবি, শিয়ালমারা হাওরের কোনো কৃষকই ধান ঘরে তুলতে পারেননি।

কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইনচান আলী। জানান, পাওনাদারের চাপ বাড়ছে। একজনকে এক লাখ টাকার সঙ্গে ২৫ মণ লাভের ধান দেওয়ার কথা ছিল। এখন কিছুই দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, “এই অবস্থায় ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারে চলে যাব।”

পাঁচ সন্তানের জনক ইনচান আলী জানান, বড় ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ত। তাকে পড়াশোনা ছাড়িয়ে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া মেয়ের পড়ালেখাও বন্ধ করে দিতে হতে পারে।

পাশের গ্রাম গুয়ারছুড়ার কৃষক সাহেব আলীর অবস্থাও একই। সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ করে চাষ করেছিলেন তিনি। অর্ধেক জমির ধানও কাটতে পারেননি। যে ধান পেয়েছেন, তা দিয়ে ঋণ শোধ তো দূরের কথা, সাত সদস্যের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত বুধবার ধান শুকানোর মাঠে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সাহেব আলী। পরে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানান, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণেই তাঁর এমন অবস্থা হয়েছে। তিনি বলেন, “এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না।”

গুয়ারছুড়া গ্রামের নূর আলী, মাসুক মিয়া ও রইছ মিয়াসহ আরও অনেক কৃষকের অবস্থাও একই রকম। স্থানীয়দের দাবি, গুয়ারছুড়া, রৌয়ারপাড় ও হাছনপছন্দ এলাকায় অন্তত ২০ জন বর্গাচাষি ঋণের চাপে চরম সংকটে আছেন।

এর মধ্যেই বেসরকারি ঋণদান সংস্থার কিস্তি আদায় অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। এক নারী কৃষক জানান, বৃহস্পতিবার সকালেও টিএলএমএস নামের একটি সংস্থার কর্মী কিস্তি তুলতে বাড়িতে যান। ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা জানালেও কিস্তি পরিশোধের চাপ দেওয়া হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই সংস্থার কর্মী একা বেগম বলেন, এলাকায় তাদের প্রায় ছয় কোটি টাকার ঋণ বিতরণ রয়েছে। তবে কেউ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিস্তি বন্ধের কথা জানাননি।

কৃষকদের অভিযোগ, ব্র্যাক, আশা ও অন্যান্য এনজিওর কিস্তিও নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে।

হাওরের কৃষি ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সুনামগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, “যারা শুধু নিচু এলাকার জমিতে চাষ করেছেন, তাদের সামনে এলাকা ছেড়ে পালানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই।”

সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় চার লাখ কৃষক রয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত ৯৮ হাজার কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত তালিকা করা হবে এবং সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হবে।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : bhorerdakonline@gmail.com, adbhorerdak@gmail.com
ফলো করুন: