ইসলামী পরিভাষায়, মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে (৮-১৩ জিলহজ) ইহরামের সাথে পবিত্র মক্কায় কাবা শরিফ এবং সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহে (আরাফা, মুজদালিফা, মিনা) বিশেষ নিয়মে ইবাদত বা যাত্রা করাকে হজ বলে।
উল্লেখ্য, শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানদের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।
পবিত্র কোরআনুল কারিমে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের উপর আল্লাহর বিধান হলো ঐ ঘরের হজ করা, যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম এই হজ ফরজ হওয়ার জন্য ৫টি সাধারণ শর্ত রয়েছে। এগুলো হলো: মুসলমান হওয়া, মানসিকভাবে সুস্থ হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, স্বাধীন হওয়া এবং আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য থাকা।
নারীদের জন্য অতিরিক্ত শর্ত: মাহরাম
নারীদের জন্য উল্লিখিত শর্তগুলোর পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি শর্ত হলো ‘মাহরাম’ থাকা। মাহরাম ছাড়া নারীদের হজের সফরে যাওয়া ইসলামী শরিয়তে বৈধ নয়; এমনকি অন্য নারীদের সঙ্গী হয়েও যাওয়া নাজায়েজ।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না’।
জনৈক ব্যক্তি আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অমুক বাহিনীর সাথে জিহাদে যাওয়ার ইরাদা করেছি, এদিকে আমার স্ত্রী হজে যাওয়ার ইচ্ছা করেছেন’। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম) বললেন, ‘তুমিও তার সাথে হজে যাও’। (সহিহ বুখারি: ১/২৫০, সহিহ মুসলিম: ১/৪৩৪)
মাহরাম না থাকলে করণীয়
যদি কোনো নারীর হজের সামর্থ্য থাকে কিন্তু মাহরাম না থাকে, তবে তার করণীয় হলো-
> অপেক্ষা করা: স্বামী বা মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।
> বদলি হজ: যদি মাহরামের ব্যবস্থা না হয় এবং বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে নিজে হজ করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন, তবে তিনি নিজের পক্ষ থেকে কাউকে পাঠিয়ে ‘বদলি হজ’ করিয়ে নেবেন অথবা মৃত্যুর আগে বদলি হজের ওসিয়ত করে যাবেন।
বিখ্যাত তাবেয়ী ইবরাহীম নাখায়ী (রহ.)-এর মতে, নারীদের জন্য মাহরাম থাকা মূলত হজের ‘সামর্থ্য’ থাকারই অন্তর্ভুক্ত। মাহরাম না থাকলে সেই নারীর ওপর সরাসরি হজে যাওয়া আবশ্যক হয় না।
মাহরাম কারা?
‘মাহরাম’ বলতে ঐসব আত্মীয়কে বোঝায়, যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া চিরতরে হারাম। বংশীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে মাহরাম হলেন-
> উর্ধ্বতন পুরুষ: পিতা, দাদা, নানা এবং তাদের উর্ধ্বতনগণ।
> অধস্তন পুরুষ: ছেলে, নাতি (ছেলের ঘরের ও মেয়ের ঘরের নাতি) এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম।
> ভাই: আপন ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই (এক বাবা কিন্তু ভিন্ন মা) এবং বৈপিত্রেয় ভাই (এক মা কিন্তু ভিন্ন বাবা)।
> মামা: মায়ের আপন, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাই।
> চাচা: বাবার আপন, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাই।
> ভাতিজা: ভাইয়ের ছেলে এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম।
> ভাগ্নে: বোনের ছেলে এবং তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম। (সূত্র: শরহু মুসলিম, নববী; উমদাতুল কারী; বাদায়েউস সানায়ে; রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া হিন্দিয়া)
উপসংহার: হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে শরিয়তের এই বিধানগুলো মেনে চলা আবশ্যক। সামর্থ্য থাকার পরও মাহরাম না পাওয়া গেলে তাড়াহুড়ো না করে শরিয়তসম্মত বিকল্প পথ (অপেক্ষা বা বদলি হজ) অনুসরণ করাই সঠিক পদ্ধতি।