দূর থেকে মনে হতে পারে আঙুর ঝুলছে। আসলে তা নয়। এটি বুনো ফল। নাম ‘রক্ত ফল’। ইংরেজিতে ব্লাড ফ্রুট। ফলটি পাহাড়িদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। চলতি মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ৪০০ টাকার বেশি দরেও বিক্রি হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে।
কেন ‘রক্ত ফল’ আলোচনায়, ভেতরে উজ্জ্বল লাল রঙ অনেকটা রক্তের মতো— তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ভাইরাল হয়েছে। এ ফলের মধ্যে আছে ভিটামিন সি, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট— যা শরীরের জন্য উপকারী। কম ক্যালোরি, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক বলে অনেকে প্রচার করছেন।
চাকমারা বলে রসকো, ত্রিপুরারা তাইথাক। অন্য সম্প্রদায়েরও রয়েছে নিজস্ব সম্বোধন। কয়েক বছর ধরে বাড়ছে ফলটির চাহিদা।
বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রাকৃতিক বনে ও বনের কাছের অনেক গ্রামে এ ফলের দেখা মেলে। পাশাপাশি ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং ত্রিপুরায় এ ফল পাওয়া যায়। তবে এ ফলের বিষয়ে বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে নথিবদ্ধ কোনো তথ্য নেই বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। দেখতে মনকাড়া এ ফলের স্বাদ টক ও মিষ্টির মিশেল।
ভারতের পরিবেশ, বিজ্ঞান ও প্রকৃতি নিয়ে কাজ করা ডাউন টু আর্থ সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রক্ত ফল মূলত প্রাকৃতিক বনে উৎপন্ন হয়। বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় এ ফল দুর্লভ হয়ে পড়েছে। কারেন্ট সায়েন্স সাময়িকীর এক নিবন্ধে এ ফলের জাত চাষের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব বলে মত দেওয়া হয়। ২০১৮ সাল থেকে ফলটি রক্ষার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে আন্দামানের জন্য সেখানকার সেন্ট্রাল আইল্যান্ড কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইসিএআর), উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য অঞ্চলের জন্য আইসিএআর গবেষণা কমপ্লেক্স ও ত্রিপুরায় কৃষি কলেজ গবেষণার কাজ করছে। শুধু সুস্বাদু ও ‘পুষ্টিগুণের’ মধ্যেই এই ফল সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন শিল্পে রং হিসেবে এ ফল কাজে লাগানো সম্ভব। ফলটি কাঁচা অবস্থায় সবুজ ও পাকলে লাল। খোসা ও বিচির মাঝখানের মাংসল অংশটা লাল রক্ত রঙের রসে ভরা। এ জন্যই এ ফলের এমন নাম। বছরে একবার ফুল হয়। ফল পাওয়া যায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত।
চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে এ ফল চাষ করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। লতা ও বীজ থেকে এর চারা উৎপাদন করা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে এর বীজ ও লতা সংগ্রহের |হিড়িক পড়েছে। রাঙামাটির বনরূপাসহ বিভিন্ন বাজারে একটি লতা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
জেলার নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের কৃষ্ণমাছড়া গ্রামে গত ৩ মে কথা হয় বাসিন্দা কালোমনি চাকমার সঙ্গে। তাঁর বাড়ির উঠানে দুটো রক্ত ফলের গাছ রয়েছে। দেখা যায়, লতানো এ গাছের গোড়া থেকে ওপর পর্যন্ত থোকায় থোকায় ফল ধরেছে। অনেক মানুষ দেখতে যাচ্ছেন। ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন অনেকে। কালোমনি চাকমা বলেন, তাঁর দুটো গাছের একটির বয়স ২০ বছর, আরেকটির ১০ বছর। কয়েক বছর ধরে গাছ দুটো থেকে পাইকারি মূল্যে ফল বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার। তিনি জানান, নভেম্বর মাসের দিকে ফুল আসে, এপ্রিল মাসে ফল পাকে। কেজিতে ৭০ থেকে ৮০টি ফল লাগে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটির উপপরিচালক কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক বলেন, ‘এই ফল নিয়ে আমাদের কাছে উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য নেই। তবে এই ফলের নাম অনেক শুনেছি। পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালিদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়।’
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক পবন কুমার চাকমা বলেন, ‘রক্ত ফল খেতে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। তবে সম্প্রতি এর চাহিদা খুব বেড়েছে। বাজারে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। চাষ করার জন্য কৃষকেরা নানা পরামর্শ চাচ্ছেন। কোনো কোনো কৃষক নিজেরাই বীজ ও লতা থেকে চারা করা শুরু করেছেন। এ ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হলে লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’ এ ফলে ভিটামিন সি ও আয়রন রয়েছে বলে জানালেন তিনি।
এ ফল খেলে শরীরে কী হয়
‘রক্ত ফলে’ থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফাইবার বেশি থাকায় হজম ভালো হয়, কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক। ত্বক উজ্জ্বল ও হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করতে পারে। ‘রক্ত ফলের’ ফ্যাট ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্রের জন্য সহায়ক।
সতর্কতা: বেশি খেলে পেট খারাপ বা ডায়রিয়া হতে পারে। লাল ড্রাগন ফল খেলে প্রস্রাব বা পায়খানার রঙ লালচে হতে পারে— এটা স্বাভাবিক, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাদের অ্যালার্জি আছে, তারা সাবধানে খাবেন।