বিয়ের তিনদিন না যেতেই ব্যাংকে ডিপিএস খোলা কথা বলে স্ত্রীর কাছে তালাক নামায় সাক্ষর নিলেন গাইবান্ধার কুদ্দুস মিয়া নামের এক স্বামী। এ যেন সংসার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ। এমন একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে গাইবান্ধা সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা এলাকায়। তালাকটি এক আসল কাজীর পরিবর্তে নকল কাজী দিয়ে সম্পাদন হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী গৃহবধূ ও এলাকাবাসীর।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সেই তরুণী জেলা দায়রা জজ আদালতে মামলা করলে বৈধ কাজী, সাক্ষী ও স্বামীসহ শ্বশুড়কে বিচারক কারাগারে পাঠালেও কাগজে কলমে কাজী না হওয়া সেই ভূয়া (কথিত) কাজী সাজ্জাদ হোসেন বর্তমানে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে রয়েছেন।
ফলে ভুক্তভোগীর পরিবার স্থানীয় ভুয়া কাজী সাজ্জাদসহ প্রতারণার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে জেলা প্রশাসন ও জেলা রেজিস্টার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ।
ভুক্তভোগী, স্থানীয় ও মামলা সূত্রে জানা যায়,গাইবান্ধা সাদুল্লাপুর উপজেলা পশ্চিম দামোদরপুর ইউনিয়নের কচুয়া পাড়া গ্রামের চাঁন মিয়ার মেয়ে চম্পা খাতুন এর সাথে নলডাঙ্গা ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে কুদ্দুস মিয়া ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর তারিখে দুই লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে ২য় বিবাহ করেন । বিবাহের তিনদিন না যেতেই চম্পা খাতুনের সরলতার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকে ডিপিএস খোলার কথা বলে তালাক নামায় স্বাক্ষর নেন তার স্বামী কুদ্দুস মিয়া।
চম্পা খাতুনের অভিযোগ, বিয়ের তিন দিন না যেতেই সংসার করতে চায় না তার স্বামী।এরপর তার স্বামী কুদ্দুস , শ্বশুর, স্থানীয় দুই ইউপি সদস্য ও নলডাঙ্গা ইউনিয়নের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার আব্দুল হামিদ কাজীর সরকারি রেজিস্টার বই সাজ্জাদ হোসেন নামের এক কথিত কাজী জোর করে প্রতারণা ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষর নেয়। পরে বাড়িতে চম্পাকে পাঠালে স্বামী মুঠোফোনের মাধ্যমে তার বাবা-মাকে জানিয়ে দেয় তালাক দেওয়ার কথা ।
এদিকে দীর্ঘ দিন চাম্পার বাবা চাঁন মিয়া সমাধনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে ২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর বৈধ কাজী ও কুদ্দুস মিয়াসহ মোট পাঁচজনের নামে আদালতে মামলা দায়ের করেন চম্পা খাতুন। এরপর আদালতে জামিন নিতে আসলে বৈধ কাজী আব্দুল হামিদ, কুদ্দুস মিয়া তার বাবা ও সাক্ষী দুজনকে বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে গাইবান্ধার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলী আদালত, সাদুল্লাপুর) পাপড়ি বড়ুয়া কারাগারে পাঠান। তবে সাজ্জাদ বৈধ কাজী না হওয়ায় আইনের ফাঁক-ফুকর থেকে বেঁচে যায়।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি এই সাজ্জাদ ২০২১ সাল থেকে আব্দুল হামিদ কাজীর সহযোগিতায় সরকারি রেজিস্টার বই নিয়ে অনৈতিক কাজ করে আসছেন।
এসব অনৈতিক কাজের ভাগ বাটোয়ার কাজী আব্দুল হামিদও পান, এইজন্যই আজ বৈধ কাজী কারাগারে। আগে থেকেই সরকারী রেজিস্টার বইয়ে কাজী আব্দুল হামিদের সীল স্বাক্ষর নিতেন সাজ্জাদ হোসেন। পরে সেই সাক্ষর ব্যবহার করে প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে আসছেন এই কথিত ভূয়া কাজী সাজ্জাদ। তারা এই ভুয়া কাজী সাজ্জাদেরও গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি করেন।
অপরদিকে নিকাহ রেজিস্ট্রার বিধিমালা অনুযায়ী জানা যায়, নির্ধারিত এলাকা ছাড়া অন্যত্র কার্যক্রম পরিচালনা, বই অন্যের কাছে হস্তান্তর বা সহকারী দিয়ে কাজ করানোর কোনো বিধান নেই অথচ এসব নিয়ম ভেঙেই চলছে একের পর এক অনিয়ম।
স্থানীয়রা বলছেন প্রশাসনের নীরবতা ও জেলা রেজিস্টারের নজরদারির অভাবেই এ ধরনের ভুয়া কাজী চক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অবতারণা চালাচ্ছে। দ্রুত এসব ভুয়া কাজীদের প্রতারণার ফাঁদ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ দাবি করছেন স্থানীয়রা।
দীর্ঘ চারদিনে তথ্য অনুসন্ধানে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, দামোদরপুর ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বৈধ কাজী মাওলানা আব্দুল হামিদকে পাশ্ববর্তী নলডাঙ্গা ইউনিয়নের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি নিজে দায়িত্ব পালন না করে তার নিকাহ রেজিস্ট্রি বই অবৈধভাবে সাজ্জাদ হোসেনের হাতে তুলে দেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাজ্জাদ হোসেন কোনো প্রকার সরকারি অনুমোদন, নিয়োগ বা সনদ ছাড়াই দীর্ঘ প্রায় ২০২১ সাল থেকে নলডাঙ্গা ইউনিয়নে নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। এতে করে আইনগত তদারকি ছাড়াই চলছিল বিয়ে ও তালাকের মতো স্পর্শকাতর কার্যক্রম চলে আসছে এলাকায়।
তবে ঘটনাটি গাইবান্ধা জুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে প্রতিবেদক অনুসন্ধান শুরু করলে চাঞ্চল্যকর একটি ভিডিও হাতে এসেছে, সেই ভিডিওতে দেখা যায়, বাবা মা ছাড়াই ভূয়া সাজ্জাদ কাজী সেই ভুক্তভোগী গৃহবধূকে বিভিন্ন বিষয় ভালমন্দ বুঝিয়ে সরকারী রেজিস্টার বইতে সাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ভুক্তভোগী নারী চম্পা খাতুন বলেন, আমার স্বামী ডিপিএস এর কথা বলে সই নিছে। আমি নিজেও জানি না তালাকের কথা বলে সই নিবে, সাজ্জাদ কাজী ও মেম্বারেরা টাকা খায়া এই কাজটা করছে। এরাই জোরপূর্বক এসব করছে।যারা আমার নতুন বিয়ার সংসার নষ্ট করলো তাদের আমি সবার শাস্তি চাই।
ভুক্তভোগি নারী চম্পা খাতুনের মা জাহানারা বেগম বলেন, হঠাৎ করে দেখি বিয়ের তিনদিন পর মাইয়া আমার বাড়িত। জামাইওক ফোন দিলে জামাই কই তোমার বেটিক তালাক দিছি। আমাক আর ফোন দেন না। পছন্দের বাহিরে আমাকে দিয়েছে বিয়া আমার পরিবার।
ভুক্তভোগী নারী চম্পা খাতুনের বাবা চাঁন মিয়া বলেন, তালাক দিছে আমি নিজেই জানি না। যারা আমার মেয়ের সাথে প্রতারণা করে সাক্ষর নিছে তাদের আমি শাস্তি চাই। সেই সাথে আমার মেয়ের দেনমোহরের টাকা চাই।
এদিকে স্বামী কুদ্দুসের মা খতেজা বেগম বলেন,মেয়ে নিজে থেকে সংসার করতে চায় না। আমার ছেলে সংসার করতে চেয়েছিল। মেয়েটা নিজেই তালাক দিয়া গেছে।
অপরদিকে ভূয়া কাজী সাজ্জাদ হোসেন নিজেকে কাজী দাবি করে বলেন, ২০২১ সাল থেকে কাজীর দায়িত্ব পালন করছি আমি।
সেদিন আমার ভুলই হয়েছে। অন্তপক্ষে বাবা মাকে ডাকা উচিত ছিল আমার। মেয়েটি মিথ্যা বলছে সে নিজে সাক্ষর দিয়েছে। তবে দেনমোহরের টাকা দেওয়ার কথা ছিল তবে তার স্বামী শুনলাম দেয় নি, এর বেশি কিছু জানি না আমি।
তবে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করলে সে বৈধ কাজী সহকারী হিসেবে পরিচয় দেন।
তবে স্থানীয়রা বলছেন সে নলডাঙ্গার সকল বিবাহ ও তালাক সম্পন্ন করে আসছেন।
স্থানীয় আনিস বলেন, একজন সরকারী লোক না হওয়া সত্ত্বেও কেন বই নিয়ে এসব কার্যক্রম চালাবে। এই তালাক করাতে লাখ টাকা নিয়ে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছে। এই ভূয়া তালাকের সাথে জড়িত সাজ্জাদ হোসেন সহ সকল জড়িতদের শাস্তি চাই ।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা রেজিষ্টার জহুরুল ইসলাম বলেন, লাইসেন্স প্রাপ্ত কাজী ছাড়া অন্য কোন কাজী বিবাহ বা তালাকের কাজ করতে পারেনা। একটি অভিযোগ পেয়েছি সেটি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমটিআই